
আঙুলের ছাপ মহান স্রষ্টার এক অনন্য ও বড় রহস্য। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় একটি শিশুর বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখনই তার আঙুলের ছাপ গঠিত হয়। অবাক করা বিষয় হলো, যমজ সন্তানের চেহারা ও কণ্ঠস্বর হুবহু এক হলেও তাদের আঙুলের ছাপ সম্পূর্ণ আলাদা হয়। কোনো কারণে আঙুলে আঘাত পেলে বা চামড়া উঠে গেলেও নতুন চামড়ায় হুবহু আগের ছাপটিই ফিরে আসে। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে পবিত্র কোরআনেও মানুষের আঙুলের ছাপের এই স্বকীয়তার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; বলা হয়েছে, একজনের আঙুলের ছাপের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কারও আঙুলের ছাপ কখনো মিলবে না।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৮৮০ থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত গবেষণার মাধ্যমে আঙুলের ছাপের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরির অধীনে বাঙালি গবেষক হেমচন্দ্র বসু ও কাজী আজিজুল হক এই যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন যে, পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যক্তি পাওয়া যাবে না, যাঁর আঙুলের ছাপ অন্য কারও সঙ্গে মিলে যায়।
অপরাধবিজ্ঞান ও আইনি তদন্তে এই আঙুলের ছাপ আজ সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। অনেক সময় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, যেখানে কোনো অজ্ঞাত বা ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ শনাক্ত করার আর কোনো উপায় থাকে না। সবাই যখন নিরাশ, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মৃতদেহের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে সহজেই তার নাম, পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা বের করে ফেলে। এরপর শুরু হয় মূল তদন্ত। নিহত ব্যক্তি কার কার সঙ্গে চলাফেরা করতেন, মোবাইলে কাদের সঙ্গে কথা বলতেন—এসব বিশ্লেষণ করে আসল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়। অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন কৌশল খাটায়, তখন তাদের মুখ থেকে আসল সত্য ঠিকই বেরিয়ে আসে। ঘরবাড়িতে চুরি বা ডাকাতির মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও ঘটনাস্থলে রেখে যাওয়া আঙুলের ছাপ ধরেই আসল অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদে আঙুলের ছাপের ব্যবহার অপরিহার্য। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে মোবাইল সিম নিবন্ধন, হারানো সিম তোলা, জমি রেজিস্ট্রি, এমনকি চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরের সময়ও আঙুলের ছাপ প্রয়োজন। আধুনিক ও উন্নত অফিসগুলোতে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের বদলে এখন আঙুলের ছাপ দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হয়। আপনার হাতের স্মার্টফোনটিও আপনার নিজস্ব আঙুলের ছাপ ছাড়া অন্যের হাতে খুলবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির সময়ও আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ স্ক্যান করা হয়। আর এই এনআইডি ছাড়া পাসপোর্ট, বিমান বা ট্রেনের টিকিট কাটা, ব্যাংক হিসাব খোলা বা ক্ষুদ্র-বৃহৎ ঋণ নেওয়া এখন একপ্রকার অসম্ভব।
প্রযুক্তির এই যুগে সত্যকে মিথ্যা বা মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাই সাময়িক আনন্দ, নিছক হাসিঠাট্টা বা সামান্য স্বার্থের লোভে অন্যের আঙুলের ছাপ বা স্বাক্ষর নকল করা থেকে আমাদের সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত। এটি একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ; অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আদালত এর উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করেন। আপনার আজকের একটি ছোট্ট ভুল আপনার আগামী কালকে এক বিভীষিকাময় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই পরিচিত বন্ধুবান্ধব, পাঠক ও আত্মীয়স্বজন সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ—আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবসময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।