সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ওয়ারিশ সনদ পেতে ৩ সাক্ষী নিয়ে ছুটতে হচ্ছে উপজেলা সদরে

জনপ্রতিনিধি না থাকায় মিরসরাইয়ে ব্যাহত নাগরিক সেবা
এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১০ মার্চ ২০২৬ | ১২:৫৯ অপরাহ্ন


সরকার পরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় চরম নাগরিক ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চারিত্রিক বা ওয়ারিশ সনদের মতো অতিপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেতে এখন দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা সদরে ধরনা দিতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। চাকরি, ব্যবসা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সময়মতো করতে না পেরে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। অর্থ ও সময়ের এই অপচয় রোধে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভার মেয়র, চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা আত্মগোপনে চলে যান। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নাগরিক সেবার কথা বিবেচনা করে সরকার ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়।

বর্তমানে উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও বারইয়ারহাট পৌরসভার প্রশাসকের বাড়তি দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার। অন্যদিকে সাতটি ইউনিয়ন ও মিরসরাই পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি)। এর মধ্যে ব্যতিক্রম কেবল ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ। সেখানে টানা ৪২ বছর ধরে মেম্বারের দায়িত্ব পালন করা প্যানেল চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।

প্রশাসক নিয়োগের পর স্থানীয়দের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে জন্মসনদ, ওয়ারিশ সনদ, চারিত্রিক সনদ কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের মতো কাজের জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত উপজেলা সদরে ছুটতে হচ্ছে। একটি ওয়ারিশ সনদের জন্য তিনজন সাক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যেতে হয়। এতে যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ সাধারণ মানুষের কয়েক হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ওয়াহেদপুর গ্রামের বাসিন্দা হেলালের ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছিলেন তার স্ত্রী শামীমা আক্তার। প্রায় ২০ দিন পর তিনি সেটি হাতে পান। শামীমা আক্তার জানান, ইউনিয়ন পরিষদে আবেদনের পর উপজেলায় দৌড়াদৌড়ি করে সাক্ষীদের নিয়ে ইউএনও কার্যালয়ে যাওয়ার পর তবেই এই সার্টিফিকেট মিলেছে। পরিষদে চেয়ারম্যান থাকলে এত কষ্ট হতো না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

এদিকে পোল্ট্রি খামারের ট্রেড লাইসেন্সের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করেছিলেন জনি নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু অনেক দিন ঘোরাঘুরির পরও তিনি সনদটি পাননি। জনি অভিযোগ করে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে গেলে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান ইউএনও স্বাক্ষর করেননি, তাই বাধ্য হয়ে তিনি সনদের জন্য দেওয়া কাগজপত্র ফিরিয়ে নিয়েছেন।

একইভাবে হিঙ্গুলী ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজন সূত্রধর জানান, একটি ওয়ারিশ সনদের জন্য তিনজন সাক্ষীকে উপজেলা পরিষদে নিয়ে যেতে যাতায়াত, খাওয়া ও সম্মানি বাবদ তার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বার থাকলে এই বাড়তি অর্থ ব্যয় হতো না বলে জানান তিনি।

জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে অনেক ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বে থাকা সচিবরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো কাজ করছেন এবং তাদের অসহযোগিতার কারণে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। তবে কাজের বাড়তি চাপের কথা তুলে ধরেছেন মঘাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বিকাশ ধর। তিনি বলেন, তাকে মঘাদিয়ার পাশাপাশি সাহেরখালী ইউনিয়নের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। তারপরও আবেদন পাওয়ার পর কাগজপত্র দ্রুত উপজেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে করেরহাট ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন জানান, তার এলাকার জনগণ কোনো ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না এবং তারা সেবার মান আগের চেয়ে আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

মিরসরাই পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, সরকার দায়িত্ব দেওয়ায় কষ্ট হলেও তা পালন করতে হচ্ছে, তবে ইউনিয়নগুলোতে গিয়ে সরাসরি দায়িত্ব পালন করা বেশ কঠিন।

তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার মানুষের দিনের পর দিন ঘোরার অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দাপ্তরিক কাজের বাইরেও তাকে আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে এবং অফিস সময়ের বাইরেও তিনি কাজ করছেন। প্রতিদিন শত শত সনদপত্রে স্বাক্ষর করে মানুষকে দ্রুত সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।