
কক্সবাজারের পেকুয়া থানার ভেতরে বিচারপ্রার্থী মা ও কলেজপড়ুয়া মেয়েকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলমকে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঘুস লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মারধরের পর উল্টো ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানোর চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর এই স্বপ্রণোদিত আদেশ দেওয়া হয়।
গত সোমবার (৯ মার্চ) কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম এক আদেশে ওসি খাইরুল আলমকে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে ঘটনার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেন। চকরিয়া থেকে পাঠানো প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
আদালত ও ভুক্তভোগীদের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মার্চ (বুধবার) বিকেলে পেকুয়া থানায় এক উপপরিদর্শকের (এসআই) সঙ্গে ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে বিচারপ্রার্থী রেহেনা মোস্তফা (৪২) এবং তাঁর মেয়ে জুবাইদা জান্নাতকে (২১) মারধর করা হয়। মারধরের পর ওই দিনই থানার ভেতরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা-মেয়ে দুজনকেই এক মাস করে সাজা দেন পেকুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম।
এরপর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার কথা বলে পুলিশ অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের দুজনকে কক্সবাজার কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। তবে তিনদিন কারাভোগের পর গত শনিবার (৭ মার্চ) আপিল শুনানি শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া সেই সাজা বাতিল করে রেহেনা মোস্তফা ও জুবাইদা জান্নাতকে বেকসুর খালাস দেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমের আদালত।
ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, জুবাইদা জান্নাতের জন্মের পরই তাঁর মা রেহেনা মোস্তফার সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২৩ মে জুবাইদার বাবা মারা গেলে সম্পত্তির ন্যায্য ভাগের জন্য তিনি নিজের চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাঁরা জুবাইদাকে অস্বীকার করায় সম্পত্তির অধিকার পেতে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন তিনি। ওই আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পেকুয়া থানাকে দায়িত্ব দিলে এর তদন্তভার পান উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ।
স্বজনদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন জুবাইদার পক্ষে দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব কুমার ঘোষ মা-মেয়ের কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন এবং পরে তাঁকে ২০ হাজার টাকা দেওয়াও হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন জমা দেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। এরপর টাকা ফেরত চেয়ে এসআই পল্লবের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়ে গত ১৩ জানুয়ারি রেহেনা ও জুবাইদা কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফা অভিযোগ করে জানান, ওই দারোগা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে তাদের থানায় যেতে বলেন। রেহেনা মোস্তফা বলেন, আমি ও আমার মেয়ে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের প্রচণ্ড মারধর করে। তিনি আরও জানান, মারধরের একপর্যায়ে ইউএনও মাহবুবুল আলম থানায় উপস্থিত হলে তারা পুলিশের এই অমানবিক নির্যাতনের কথা তাকে জানান।
রেহেনা মোস্তফা আক্ষেপ করে বলেন, তখন আমরা মনে করেছিলাম ইউএনও স্যার আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন, কিন্তু তিনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে সোজা ওসির রুমে চলে যান। এরপর চিকিৎসার নাম করে পুলিশ তাদের গাড়িতে তুলে সোজা কারাগারে নামিয়ে দিয়ে আসে।
থানার ভেতরে পুলিশ সদস্য কর্তৃক বিচারপ্রার্থী মা-মেয়েকে এভাবে মারধরের ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে গত সোমবার (৯ মার্চ) বিষয়টি স্বপ্রণোদিত হয়ে আমলে নেন কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম। আদালত তার আদেশে ঘটনার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা এবং থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
পাশাপাশি অভিযুক্তদের আটক করার কারণ এবং পরবর্তীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য উপস্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে ১৬ মার্চের মধ্যে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলমকে নির্দেশ দেন আদালত।
একই আদেশে বিচারক ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার–সংক্রান্ত নথিপত্র, ডিউটি রেজিস্ট্রার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য সব প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করারও কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন।
আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভুক্তভোগী জুবাইদা জান্নাতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজবাহ উদ্দীন। তিনি বলেন, পেকুয়া থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পেকুয়া থানার ওসিকে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
অ্যাডভোকেট মিজবাহ উদ্দীন আরও মনে করেন, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি নিয়ে বিজ্ঞ আদালতের এমন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং স্বপ্রণোদিত নির্দেশনা বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণের মাঝে আইনের শাসন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি অনন্য ভূমিকা রাখবে।