সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে গভীর সংকটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত

পরিবহন ব্যবস্থায় চরম অনিশ্চয়তা
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১১ মার্চ ২০২৬ | ১:০১ অপরাহ্ন


মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন শুধু ওই অঞ্চলের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত করছে না, বরং তা বাংলাদেশের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও আকাশপথগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশের রফতানি খাত। গত আট মাস ধরে চলতে থাকা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন সংকট যুক্ত হওয়ায় এক অভূতপূর্ব চাপের মুখে পড়েছেন পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা।

দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো ইউরোপের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। জরুরি পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে আকাশপথের ওপর বড় নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় দুবাইয়ের মতো ব্যস্ত আন্তর্জাতিক হাব অচল হয়ে পড়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদের মতো প্রধান এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি এয়ার কার্গো মূলত উপসাগরীয় হাব হয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে ইউরোপগামী পোশাকের চালান এখন ঢাকাসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়ছে।

আকাশপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ কনটেইনার জাহাজ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু এই রুটটি এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ বিকল্প পথে ঘুরে যেতে হচ্ছে, যার ফলে শিপিং লাইনগুলো নতুন বুকিং নিতে চাইছে না। বীমা ব্যয় ও পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং পণ্য পৌঁছাতেও অনেক বেশি সময় লাগছে।

এ বিষয়ে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ১০ শতাংশ আকাশপথে এবং ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জাহাজে করে উপসাগরীয় রুটে পরিবহন করা হয়। আগে ভারতের ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার করে ট্রাকে পণ্য পাঠিয়ে সেখান থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ে আকাশপথে পরিবহন করা গেলেও, বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। গালফ রুটও কার্যত অচল হওয়ায় এখন প্যাসিফিক রুটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। দ্রুত চালান পাঠানোর ক্ষেত্রেও ক্রেতাদের চরম বিঘ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই পরিবহন সংকটের পাশাপাশি দেশের রফতানি খাত আগে থেকেই ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জুলাই মাসের পর টানা সাত মাস ধরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা আরো ঘনীভূত হবে। লোহিত সাগরের সংকটের কারণে সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ হওয়ায় জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে কেপটাউন দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে আটলান্টিক ঘুরে যেতে হচ্ছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে এমন পরিস্থিতিতে পরিবহন খরচ বা ফ্রেইট চার্জ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল এবং বর্তমানেও সেই একই আশঙ্কা তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে।