সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কোরআন ছুঁয়ে আনুগত্যের শপথ নেয় সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যরা

চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি: থানা থেকে লুটের অস্ত্রসহ সাজ্জাদ বাহিনীর ৩ সদস্য গ্রেপ্তার
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১১ মার্চ ২০২৬ | ১২:৫২ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রাম নগরে পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের চন্দনপুরার বাসায় রীতিমতো কমান্ডো স্টাইলে হামলার ঘটনা ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন সন্ত্রাসী দুই হাতে পিস্তল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), চাইনিজ রাইফেল এবং শটগান নিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ছে।

এই ভয়াবহ হামলার নেপথ্যের কারণ ছিল দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ১০ কোটি এবং পরে ৫ কোটি টাকার চাঁদা দাবি। চাঁদা না পেয়ে এর আগেও ২ জানুয়ারি ওই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ লিখে হুমকিও দিয়েছিলেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ।

লুণ্ঠিত অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার তিন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী

মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় এই দুঃসাহসিক হামলার তদন্তে নেমে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর তিন দুর্ধর্ষ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সোমবার দিবাগত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের জালে আটকানো হয়।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায় সিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ও অতিরিক্ত দায়িত্ব (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—২০০০ সালের চাঞ্চল্যকর আট খুনের (এইট মার্ডার) মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন এবং তার দুই সহযোগী মনির ও সায়েম।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রেপ্তার এই তিনজনই মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে হামলায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। চকবাজার থানা পুলিশ প্রথমে মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমনকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়তলী থানা থেকে লুণ্ঠিত হওয়া একটি বিদেশি রিভলভার ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

এরপর রিমনের দেওয়া তথ্যে পাঁচলাইশ থানার অভিযানে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মনির। মনিরের তথ্যে ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস ৯ এমএম পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

সবশেষে মনিরের দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার হন সায়েম। তার স্বীকারোক্তিতে খুলশী এলাকা থেকে একটি এসএমজি, দুটি ম্যাগাজিন ও ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়, যা সায়েম পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে কিনেছিলেন বলে পুলিশকে জানান।

আনুগত্যের প্রমাণ: কোরআন ছুঁয়ে জীবন দেওয়ার শপথ

এই বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি উন্মোচিত হয়েছে রিমনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে। মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমনকে এই বাহিনীর প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, নতুন সদস্যদের পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর প্রতি অনুগত থাকার ভয়ংকর শপথ করানো হচ্ছে। শপথকারী বলছেন, কোরআনের ওপর হাত রেখে নিজের জীবন সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের জন্য মরতে প্রস্তুত, কিন্তু কখনো বেইমানি করব না।

ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে একজন পুরোনো বিশ্বস্ত সদস্যকে জামিনদার থাকতে হতো এবং এই শপথের ভিডিও দুবাইয়ে বসে থাকা সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে সদস্যপদ নিশ্চিত করা হতো।

ইন্টারপোলে রেড নোটিশভুক্ত সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নির্দেশে এরা পুরো নগরীতে খুন, চাঁদাবাজি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এই গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল, যা ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হবে।

ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে ডিবির বিশেষ অভিযান

সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি মাহে রমজান উপলক্ষে নগরীতে শান্তি বজায় রাখতে সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল কোতোয়ালী থানায় আলাদা একটি অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে পেশাদার ছিনতাইকারী মারুফ হোসেন তুষার, বাবু এবং মেহেদী হাসানকে আটক করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, সিএমপির বিভিন্ন থানায় মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছয়টি, বাবুর বিরুদ্ধে ছয়টি এবং মারুফ হোসেন তুষারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে।