
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় পবিত্র রমজান মাসে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
দিনের বেলায় বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার প্রায় সব ইউনিয়নেই প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে।
অনেক সময় টানা ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, আবার কখনো আধা ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা–যাওয়া করছে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যা ও রাতেও বাড়ছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা।
ফাল্গুন মাস শেষ না হতেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। এই সময় ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের ভোগান্তিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অনেক এলাকায় রাতের পর রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতেও পারছেন না বাসিন্দারা।
কেরানীহাট সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, দিনে অন্তত ছয়-সাতবার বিদ্যুৎ আসা–যাওয়া করছে। একবার গেলে দীর্ঘ সময়েও ফিরে আসে না।
বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান মো. শাহাদাত হোসেন।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, গরম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
সারাদিনে চার ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না এবং সন্ধ্যার পর বাচ্চাদের পড়ালেখাও ব্যাহত হচ্ছে বলে আক্ষেপ করেন সিরাজুল ইসলাম।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় পড়াশোনার সময়টাতেই অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে না, ফলে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
সাতকানিয়ার বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যেসব দোকানে ফ্রিজ, ফ্রিজার বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
উপজেলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্প ও কারখানাতেও বিদ্যুৎ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, কাঠের কারখানা, প্রিন্টিং প্রেসসহ নানা ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
একটি ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপের মালিক দেবু বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে এবং তাদের সব কাজই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
বিদ্যুৎ না থাকলে কোনো কাজ করা যায় না বিধায় অর্ডার নিয়ে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছেন না বলে জানান দেবু।
বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে পানির জন্য মোটর বা গভীর নলকূপ ব্যবহৃত হওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকলে পানি তোলা সম্ভব হয় না।
পশ্চিম সাতকানিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে মোটর চলে না। ফলে পানি তোলা যায় না, এতে ঘরের দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা হয়।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেবা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। অনেক হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে রোগী সেবায় জটিলতা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আগে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা দেওয়া হয় না। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষ কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান না।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা–যাওয়ার কারণে অনেকের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফ্রিজ, টেলিভিশন, কম্পিউটারসহ নানা যন্ত্রপাতির ক্ষতির অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি–১ এর সাতকানিয়া জোনাল অফিসের ডিজিএম মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে কিছু এলাকায় সাময়িক লোডশেডিং করতে হয়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা কাজ করছেন বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।