সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দেশে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত, ৮০ ভাগেরই মৃত্যু বিনা চিকিৎসায়

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ মার্চ ২০২৬ | ১১:০৩ অপরাহ্ন


কিডনি মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। শরীরে বিপাকের মাধ্যমে যে ময়লা ও দূষিত পদার্থ তৈরি হয়, কিডনি সেগুলোকে প্রস্রাবের সাহায্যে বের করে দেয়।

কারও একবার কিডনি বিকল হলে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ দেখা যায় না।

তখন কিডনি ডায়ালাইসিস (কৃত্রিমভাবে শরীরের রক্ত পরিশোধন) বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট (কিডনি প্রতিস্থাপন বা সংযোজন) ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো বিকল্প উপায় থাকে না।

রোগটির চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে কিডনি বিকল রোগীদের প্রায় ৮০ ভাগই বিনা চিকিৎসায় মারা যায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

কিডনিকে সুস্থ রাখা এবং কিডনি রোগীদের প্রতি যত্নবান হতে ২০০৬ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রলজি (আইএসএন) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর কিডনি ফাউন্ডেশনের (আইএফকেএফ) যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর মার্চের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব কিডনি দিবস পালিত হয়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিডনি রোগের প্রকোপ দিনদিন বেড়েই চলছে এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ রোগের হার উন্নত দেশের চেয়ে অনেক বেশি।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত।

কিডনি বিকল রোগের চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি যে, দেশের শতকরা মাত্র ১০ থেকে ২০ ভাগ মানুষ তা বহন করতে পারে এবং বাকিরা মাঝপথে চিকিৎসা নেওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ বলেন, সুস্থ জীবনধারা চর্চার মাধ্যমে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ আরও বলেন, এজন্য নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত সুষম খাবার গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শরীরে তরল ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

ফাস্টফুড, মাদক ও ধূমপান পরিহার করে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে বলে পরামর্শ দেন অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ।

একই সঙ্গে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখা, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত চেক-আপে থাকা এবং শিশুর জন্মগত কিডনি রোগ আছে কি না পরীক্ষা করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেন অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ।

তিনি দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুত মহামারির দিকে যাচ্ছে, যার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন ভয়াবহ হুমকি হিসাবে যুক্ত হয়েছে।

ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য, ফল-ফসলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট কিডনি রোগকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

যখন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হয়, তখন প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর দীর্ঘস্থায়ী হার্টের সমস্যা দেখা দেয় এবং দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪ থেকে ২২ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে (সিকেডি) আক্রান্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে বর্তমানে ৮৫ কোটির অধিক মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৭৫ কোটি রোগী জানেই না যে মরণঘাতী কিডনি রোগ নীরবে তাদের কিডনি নষ্ট করে চলেছে।

শঙ্কা রয়েছে, বিশ্বে ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসার অভাবে অকালমৃত্যু হবে।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীর হার ১৬ থেকে ১৮ ভাগ। তাই বছরে অন্তত একবার হলেও কিডনি পরীক্ষা করা উচিত।

ইউরিন আরই, ক্রিয়েটিনিনের মতো সাধারণ পরীক্ষা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ করলেই কিডনিতে সমস্যা আছে কি না, তা জানা যাবে, তাই জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের ইউরোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, কিডনি বিকল হয়ে গেলে রোগীর প্রকৃত চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন।

এর মাধ্যমে রোগীরা আগের মতো জীবনযাপন করতে পারেন, এমনকি নারীরা গর্ভধারণ ও সন্তান জন্ম দিতে পারেন বলে জানান অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম।

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম আরও বলেন, এজন্য ট্রান্সপ্ল্যান্ট (কিডনি প্রতিস্থাপন) বাড়াতে হবে। দেশে প্রতিবছর যতসংখ্যক ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন, এর ৫ শতাংশের বেশি আমরা করতে পারি না।

সারা বছরে ৪৫০ ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে পারি, যার বেশির ভাগই হয় বেসরকারি পর্যায়ে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আমাদের সাশ্রয়ী লেভেলে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে এবং বেসরকারি লেভেলে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হাসপাতাল মালিকদের করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ও বিএমইউ-এর ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন থেকে পরবর্তী ফলোআপ পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ টিমের অভাব রয়েছে।

অঙ্গপ্রতঙ্গ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো রোগী আইসিইউতে ‘ব্রেন ডেথ’ হলে সেটি যথাসময়ে ডিক্লারেশন হচ্ছে না।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দক্ষ ব্যবস্থাপনা টিম তৈরি করতে হবে এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতে রেফারেল সিস্টেমে উন্নতি করতে হবে বলে ডা. মো. রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কিডনি অকেজো রোগীদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হিমোডায়ালাইসিস করা হচ্ছে, তবে উন্নত বিশ্বে পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস হয়।

পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ডায়ালাইসিস ফ্লুইড বাংলাদেশে নেই, এজন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার।

সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপের মধ্য দিয়ে ওষুধশিল্পকে সহযোগিতা করলে ডায়ালাইসিস চিকিৎসা ব্যয় কমবে।

এছাড়া কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোডাক্টের উৎপাদনে সরকার ভ্যাট মওকুফ করলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় লাঘব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন।