সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল সম্পদ উদ্ধারে সরকারের সর্বাত্মক অভিযান

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৪ মার্চ ২০২৬ | ১২:১০ অপরাহ্ন


বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছে বর্তমান সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দেওয়ানি এবং ফৌজদারি—উভয় ধরনের আইনি কার্যক্রমই পুরোদমে শুরু করা হয়েছে।

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেশে ও বিদেশে চলছে নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি। সংগৃহীত তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাইয়ের পর দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অকাট্য প্রমাণ হাতে এলেই কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মামলা দায়ের করা হবে, যদিও দেশের অভ্যন্তরে ইতোমধ্যেই বহুমুখী তদন্তের ভিত্তিতে মামলা দায়েরের কাজ বেশ গতি পেয়েছে।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর এই কঠিন লড়াইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নিয়েই বিষয়টিকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সম্পদ উদ্ধারে বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই কার্যক্রমের শক্ত ভিত রচিত হয়েছিল। সে সময় সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ১০ কোটি ডলারের একটি লিটিগেশন ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করে গেছেন। সেই অসম্পূর্ণ কার্যক্রমটিই এখন আরও বেগবান করে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

জব্দ হচ্ছে রাঘববোয়ালদের সম্পদ

পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের সম্পদ জব্দের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। সরকারের জোরালো ও সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাজ্যে সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেশ কিছু সম্পদ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। দেশের ভেতরেও সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের ঋণ জালিয়াতির তথ্য নিবিড় তদারকির মাধ্যমে উদ্‌ঘাটন করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক চুক্তি

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দেশের ব্যাংকগুলোকেও সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে এই প্রক্রিয়ার সম্মুখভাগে রাখা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ছয়টি বৃহৎ গ্রুপকে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার চূড়ান্ত ধাপে পাচারকারী দেশে মামলা করা হবে। এই ধাপ শেষে শীর্ষ পাচারকারীদের আরও শতাধিক ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের দশটি ব্যাংক নয়টি আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি সুনির্দিষ্ট পাচারের ঘটনার বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকেই কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিশন দেওয়া হবে, কোনো নগদ অর্থ আগে থেকে প্রদান করতে হবে না।

সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র থেকে নিরলসভাবে পাচারকারীদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। প্রাপ্ত তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডিকে দেওয়া হচ্ছে, যার ভিত্তিতে দেশে মামলা হচ্ছে। দেশে পাচারকারীদের আইনিভাবে শনাক্ত করা গেলে বিদেশে আইনি লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সাথে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পদ জব্দের এই আইনি প্রক্রিয়া ভবিষ্যতেও শক্ত হাতে অব্যাহত থাকবে।