
দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে এবার বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলেও বর্তমান সরকার এখন ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ঋণে অর্থায়নের পথ খুঁজছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আইডিবির কাছে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঋণের সুদহার ও অন্যান্য শর্তে দুই পক্ষের সমঝোতা হলে আইডিবির ঋণেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। তবে ঋণের শর্তে একমত না হলে বিকল্প পথে হাঁটবে সরকার। সেক্ষেত্রে চীনের এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এ প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, আইডিবি এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আরও জানান, পরবর্তী সময়ে এই ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ প্রকল্পে অর্থায়নে আইডিবিকে অনুরোধ করা হলেও বিষয়টি আর এগোয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইআরএল প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় গত ৮ মার্চ আইডিবির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসেছিল। চার দিনের এই সফরে দলটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং ইআরডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে ১১ মার্চ জেদ্দায় ফিরে যায় আইডিবির প্রতিনিধিদলটি।
সরকারের কাছে বেশ কিছু তথ্য চেয়েছে আইডিবি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, সরকার ইতিমধ্যে আইডিবির চাওয়া সমীক্ষা প্রতিবেদন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), সরকারি ক্রয়কৌশল পরিকল্পনা, ঋণছাড় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার যাবতীয় তথ্য পাঠিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি হবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) আবদুল মান্নান জানান, আইডিবি এ প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আবদুল মান্নান আরও জানান, আইডিবির ঋণের বর্তমান সুদহার সাড়ে ৩ শতাংশ, যার গ্রেস পিরিয়ড ৩ থেকে ৫ বছর এবং পরিশোধকাল ২০ থেকে ২৫ বছর। তবে সরকার চায় এই সুদহার দেড় শতাংশের মধ্যে রাখতে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ২৩ ডিসেম্বর একনেক সভায় ইআরএল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন বিদেশি ঋণ প্রক্রিয়ায় গেলে সময় আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা রয়েছে।
‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে এই প্রকল্পটি প্রথম নেওয়া হয় ২০১২ সালে। এরপর অন্তত ১১ বার ডিপিপি সংশোধিত হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘ বিলম্বের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পেলেও অর্থায়ন কাঠামো আবার পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। মূলত নিজেদের টাকায় এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকায় এবং বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ এড়াতেই সরকার বিদেশি ঋণের পথে হাঁটছে।
বিপিসি জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা বর্তমান ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে প্রায় ৫৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এতে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা গেলে দেশে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষায় দেশে ব্যবহৃত কিছু জ্বালানি তেলে নির্ধারিত মাত্রার (৩৫০ পিপিএম) চেয়ে অনেক বেশি সালফার পাওয়া গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পরিবেশসহায়ক জ্বালানি তেল উৎপাদন সম্ভব হবে এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি-নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে।