সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ঈদে দর্শনার্থী বরণে নবরূপে প্রস্তুত ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক

এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ২০ মার্চ ২০২৬ | ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন


পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে ভ্রমণপিপাসু পর্যটক ও দর্শনার্থীদের বরণে এবার নবরূপে সাজিয়ে তোলা হয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ককে। ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের আগমন ঘিরে নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে পার্কের ভেতর-বাইরের পর্যটন স্পটগুলোকে নান্দনিক রূপে সাজানোর পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রথম পর্যটন স্পট ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। শতবর্ষী গর্জনসমৃদ্ধ বনের ভেতরে লোহার বেষ্টনীতে বসবাস করছে বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রাণী। প্রাণী হলেও যত্নের মমতায় বেড়ে ওঠা এসব প্রাণী পরিচর্যাকারীর ডাকে সাড়া দেয়। বেষ্টনীর ভেতরে বাঘ-সিংহের খেলাধুলা আর হুংকার দেখে আনন্দ পান দর্শনার্থীরা। ১৯৯৯ সালে এই সাফারি পার্কের যাত্রা শুরু হয়। এর আগে ১৯৮০ সালে এটি একটি হরিণ প্রজননকেন্দ্র ছিল। ভেতর-বাইরে ৯০০ হেক্টর আয়তনের বনভূমি নিয়ে যাত্রা করা দেশের প্রথম এই সাফারি পার্কে বিপুল পরিমাণ মাদার ট্রিসহ (গর্জন) নানা প্রজাতির বনজ গাছ রয়েছে।

সাফারি পার্ক হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়ার আগে থেকেই সবুজের সমারোহে দৃষ্টিনন্দন পার্কটি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শিক্ষার্থীরা এই পার্ক থেকে প্রকৃতিবিষয়ক নানা জ্ঞান আহরণ করতে পারে। সপ্তাহের মঙ্গলবার ছাড়া বাকি ছয় দিন ভ্রমণপিপাসুদের উচ্ছ্বাসে ও প্রাণীকুলের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্কের সর্বত্র।

সাফারি পার্কে আগে প্রাপ্তবয়স্করা ৫০ টাকা এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশু-কিশোররা ৩০ টাকার টিকিটে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পার্কের দৃশ্যমান সৌন্দর্যবর্ধনের কারণে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালের মে মাসের নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শনার্থী প্রবেশ ফি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিজনের প্রবেশ ফি ১০০ টাকা ও শিশু-কিশোরদের জন্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাঁটতে অক্ষম দর্শনার্থীরা চাইলে নির্ধারিত ফি দিয়ে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মিনিবাসে করে পুরো পার্ক ঘুরে দেখতে পারেন।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সাফারি পার্কে দেড় ডজন বেষ্টনীতে কঠোর নিরাপত্তায় হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তী, গয়াল, আফ্রিকান জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, ভালুক, বন্য শূকর, হনুমান, ময়ূর, কুমির, সাপ, বনগরুসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী পালন করা হচ্ছে। পার্কজুড়ে আরও রয়েছে চিত্রা, মায়া, সম্বর ও প্যারা হরিণ। এখানে ৫২ প্রজাতির ৩৫০টি প্রাণী এবং জানা-অজানা বিচিত্র ধরনের কয়েক শ প্রজাতির পাখি রয়েছে। উন্মুক্ত অবস্থায় আছে ১২৩ প্রজাতির ১ হাজার ৬৫টি প্রাণী, যার মধ্যে গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খেঁকশিয়াল ও বনরুই উল্লেখযোগ্য। পার্ক ভ্রমণের সময় অসংখ্য বানর, শিয়াল, খরগোশ, হরিণসহ নানা বন্য প্রাণীর দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। দর্শনার্থীরা এসব দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ চৌধুরী জানান, বেষ্টনী অনুসারে সাফারির চারপাশে নিরাপদ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ পথ তৈরি হয়েছে। প্রবেশ ও বাইরের জন্য স্বয়ংক্রিয় ফটক এবং যান চলাচলের উপযুক্ত পাকা সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে। বাঘ-সিংহসহ হিংস্র প্রাণী বনে মুক্ত করে দেওয়া হলে খাঁচাযুক্ত গাড়িতে দর্শনার্থীরা সংশ্লিষ্ট বেষ্টনীতে ঢুকে বিচরণরত বাঘ-সিংহ অবলোকন করতে পারেন। পুরো সাফারি পার্ক দেখার জন্য নান্দনিক ও সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে উঠে পর্যটকেরা এক মুহূর্তের মধ্যে পার্কের অপরূপ সৌন্দর্য দর্শন করতে পারেন।

আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ চৌধুরী আরও বলেন, পার্কের বাইরে পার্কিং-সংলগ্ন এলাকায় ফুলবাগান সাজানো হয়েছে। পার্কের দক্ষিণে পিকনিক স্পট, শিশু বিনোদনকেন্দ্র এবং পাহাড়ের পাদদেশে কৃত্রিম লেক তৈরি করা হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে পার্কের মাঝখানের শতাধিক ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার এবং বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য আলাদা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক রয়েছে। দর্শনার্থীরা চাইলে নির্ধারিত ফি দিয়ে হাতির পিঠেও ঘুরে বেড়াতে পারবেন।

সাফারি পার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনজুর আলম জানান, প্রতিষ্ঠার দুই যুগে এসে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এই অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর দুই ঈদের পাশাপাশি এখানে বার্ষিক পিকনিক করতে অনেক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান আসে। মনজুর আলম আরও জানান, এবারের রোজার ঈদে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন নিশ্চিত করতে তাঁরা সাফারি পার্ককে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন, ফলে ঈদের টানা ছুটিতে দর্শনার্থীরা মনোরম পরিবেশে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সেখানে আলাদাভাবে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। তারপরও রোজার ঈদে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে চকরিয়া থানা-পুলিশ সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে মো. মনির হোসেন নিশ্চিত করেন।