সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

এলএনজি সরবরাহে ৫ বছরের ‘ফোর্স মাজর’ কাতারের, শঙ্কায় বাংলাদেশ

১৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ফোর্স মাজর
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ মার্চ ২০২৬ | ১:২৬ পূর্বাহ্ন


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে এলএনজি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ‘ফোর্স মাজর’ বা দৈব কারণবশত চুক্তি পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করতে হবে বলে জানিয়েছে কাতার সরকার। ইতিমধ্যে ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাতারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাদ আল-কাবি।

পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত কাতারএনার্জির ফোর্স মাজর ঘোষণা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় দফায় রাস লাফান সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই ঘোষণার সময়সীমা আরও বাড়বে কি না, সে বিষয়ে আপাতত কিছু জানাতে পারেননি তাঁরা।

ফোর্স মাজর মূলত একটি ফরাসি শব্দগুচ্ছ। এর মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে এমন একটি ধারাকে বোঝায়, যেখানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো ঘটনার কারণে চুক্তি পালনের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। অর্থাৎ অপ্রত্যাশিত ও অনিবার্য পরিস্থিতি—যেমন যুদ্ধ, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা কোনো পক্ষকে চুক্তির শর্ত পূরণ করতে অসমর্থ করে তোলে। এর মাধ্যমে কোনো দায়ভার ছাড়াই চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক দায়মুক্তি বা চুক্তি বাতিল করা যায়।

জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারএনার্জির ১৫ বছর মেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি সই করে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটি। এরপর ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে এলএনজি কার্গো সরবরাহ শুরু করে কাতার। এই চুক্তির আওতায় চলতি অর্থবছরেও ৪০ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করার কথা রয়েছে কাতারএনার্জির।

তবে কাতারের এলএনজি স্থাপনায় ইরানের হামলার পর দেশটি থেকে এলএনজি আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফোর্স মাজর ঘোষণার ফলে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না বলে আগেই বাংলাদেশকে জানিয়েছে কাতারএনার্জি। কিন্তু বুধবার রাতে দ্বিতীয় দফায় কাতারএনার্জির এলএনজি অবকাঠামোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে বিভিন্ন দেশেই এলএনজি সরবরাহ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাতারের এলএনজি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ফোর্স মাজর ঘোষণার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ঘোষণা আসতে পারে কি না, সে বিষয়ে এখনো কাতারের পক্ষ থেকে কিছু জানতে পারেননি পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে এলএনজি সরবরাহ পেতে সার্বক্ষণিক কাতারএনার্জির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানান, এলএনজি আমদানিতে কাতারএনার্জি বাংলাদেশের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফোর্স মাজর ঘোষণা করেছে। এরপর আগামী ২৫ এপ্রিল পরবর্তী কার্গো সরবরাহ দেওয়ার শিডিউল রয়েছে। এখন এপ্রিলের কার্গো পাওয়ার জন্য কাতারএনার্জির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে মো. এরফানুল হক উল্লেখ করেন। ঈদের ছুটির কারণে সাময়িক বিরতি থাকলেও তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিতে বিভিন্ন দেশের জন্য কাতারএনার্জি ফোর্স মাজর ঘোষণা করলেও বাংলাদেশের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি বলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানান।

কাতারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির সিইও সাদ আল-কাবি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দুটি এলএনজি ট্রেনের কারণে ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের জন্য নির্ধারিত দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত কাতারএনার্জিকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ‘ফোর্স মাজর’ ঘোষণা করতে হবে। সাদ আল-কাবি আরও বলেন, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়ায় তাঁদের ফোর্স মাজর ঘোষণা করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য এটি ঘোষণা করা হলেও এখন তা ক্ষয়ক্ষতির সময়কাল অনুযায়ী চলবে বলে তিনি জানান।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আঘাতে রাস লাফান সিটির বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়ে কাতারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি রয়টার্সকে আরও বলেন, রাস লাফান সিটিতে এই হামলায় এলএনজি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কাতার সরকারের বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের আয় কমে যাবে। যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো নির্মাণে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে সাদ আল-কাবি উল্লেখ করেন।