সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কক্সবাজার সৈকত দখলমুক্ত, ভাসমান দোকান উচ্ছেদ দেখলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সৈকতের বালিয়াড়িতে উচ্ছেদ অভিযান, কার্ড বাণিজ্য বন্ধের দাবি
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২২ মার্চ ২০২৬ | ৯:৩৬ অপরাহ্ন


কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কক্সবাজার সৈকত দখল করে গড়ে ওঠা বালিয়াড়িতে কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকবে না। ইতিমধ্যে ভাসমান দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সৈকতের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান। পাশাপাশি যাঁরা প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাঁদেরকে পুনর্বাসন করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

এর আগে গত ৯ মার্চ কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এক সপ্তাহের মধ্যে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে ভাসমান অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলীতে টানা অভিযান চালিয়ে ৫ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রশাসন। এই উচ্ছেদকৃত স্থান পরিদর্শনের জন্যই আজ সৈকতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানসহ বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন উদ্যোগে সৈকতের অনেক এলাকার চেহারা পাল্টে গেছে। ভাসমান দোকান সরে যাওয়ায় সড়ক থেকে এখন সরাসরি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সৈকতের বালিয়াড়ি এবং আছড়ে পড়া নীল ঢেউ। ঈদের ছুটিতে তাই পর্যটকেরা সৈকতের এক নতুন রূপ দেখতে পাচ্ছেন বলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান বলেন, প্রতিবছর কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন ৬০ থেকে ৭০ লাখ পর্যটক এবং বেশির ভাগ পর্যটক একবারের জন্য হলেও সৈকতে আসেন। পর্যটকেরা সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকানের বস্তি দেখে আগে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন এবং সেখানে নানা অপরাধও ঘটত। ঝুপড়িমুক্ত হওয়ায় এখন সৈকতের চেহারা পাল্টে গেছে উল্লেখ করে মাহবুবর রহমান আরও বলেন, এতে পর্যটকেরা নতুন রূপ দেখতে পাচ্ছেন এবং পাশাপাশি সমুদ্রের দূষণও কমবে।

সৈকতে কার্ড বাণিজ্য

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় তিন দশক আগে ‘বিচ ম্যানেজমেন্ট’ বা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। পদাধিকারবলে এই কমিটির সভাপতি হলেন জেলা প্রশাসক। সরকার পরিবর্তন হলে কমিটির কিছু সদস্যও পরিবর্তন হয় এবং মূলত ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কমিটিতে যুক্ত হন। গত ৫ আগস্টের পর এই কমিটি এখনো পুনর্গঠন করা হয়নি।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের নামে পাঁচ শতাধিক ‘কার্ড’ বা পরিচয়পত্র দিয়েছিল বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। অভিযোগ রয়েছে, এই কার্ডধারীদের বেশির ভাগই বহিরাগত। স্থানীয় বাসিন্দারা সেই কার্ড ভাড়া নিয়ে সৈকতে দোকান খুলে ব্যবসা করেন। প্রতিবছর ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ওই কার্ড নবায়ন করতে হয়। কিন্তু কার্ডধারীরা তা অন্যদের কাছে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেন। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ১৪টি শর্ত বেঁধে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হচ্ছে—কার্ড বা পরিচয়পত্র হস্তান্তর করা যাবে না, নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কিন্তু এসব শর্তের বেশির ভাগই দোকানিরা মানেন না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, প্রতিবছর কার্ড বাণিজ্য থেকে অন্তত ১৫ কোটি টাকা পাওয়া যায়। এই বিপুল অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, তা কেউ জানে না এবং বিভিন্ন সময় হিসাব চেয়েও পাওয়া যায়নি বলে অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক দাবি করেন। তবে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, সৈকত রক্ষণাবেক্ষণ, আলোকায়নসহ নানা কাজেই এই অর্থ ব্যয় করা হয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশনা অনুযায়ী সুগন্ধা পয়েন্টে স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটি চক্র কার্ড বাণিজ্যে নেমেছে। চিহ্নিত দখলবাজ চক্র উচ্ছেদের বিরোধিতা করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চক্রান্ত চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সমুদ্র পরিবেশ রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই কার্ড বাণিজ্য পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে হবে।