
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর কাব্যগাথার উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধের সূচনা করতে চাই। ‘অসত্যের কাছে কভু নত নাহি হবে শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর।’ বাঙালি বীরের জাতি। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিপুল প্রাণ বিসর্জনসহ ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর আমাদের মহান স্বাধীনতা। পৃথিবী নামক গ্রহে লাল-সবুজ পতাকার এই রাষ্ট্রের উত্থানের পেছনে রয়েছে বিশাল ঐতিহাসিক গতিধারা।
১৯৫২ সালে ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন মহান স্বাধীনতার রোডম্যাপ তৈরিতে যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে প্রতিভাত। ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ৬ দফা ও পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের সাবলীল গতিধারায় একাত্তরের মার্চ বাঙালির স্বাধীনতার নতুন পথপরিক্রমা উন্মুক্ত করে।
বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপরিক্রমায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল উত্তাল ঘটনাপঞ্জিতে পরিপূর্ণ। ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর যথাক্রমে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পাঁচটি প্রদেশে প্রাদেশিক পরিষদের উভয় নির্বাচনে বাঙালিরা একক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর দলের কূটকৌশলের নগ্ন প্রকাশে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসকের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা এবং গভীর রাতে সামরিক আইন পরিচালক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের সংহতি বা সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী খবর-মতামত-চিত্র প্রকাশের ব্যাপারে সংবাদপত্রগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১১০ নং সামরিক আইন জারির ফলে বাংলায় অবিস্মরণীয় এক দ্রোহী রূপ পরিগ্রহ করে।
বিক্ষুব্ধ বাঙালি এর প্রতিবাদে ১ মার্চ থেকে সারা দেশে চলমান ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উত্তাল মিছিল-স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় ও ৩ মার্চ সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ২ মার্চ হরতাল, মিছিল ও কারফিউর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। হরতাল চলাকালীন সামরিক জান্তার হিংস্র বাহিনীর গুলিতে তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র আজিজ মোর্শেদ ও মামুনসহ পঞ্চাশ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
সামরিক আইন প্রশাসক ওইদিন ও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেন। কারফিউ ভেঙে বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৩ মার্চ মিছিলে গুলিবর্ষণে ঢাকায় ২৩ জন ও চট্টগ্রামে ৭৫ জন নিহত হন। এই দিন পাঠ করা হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ইশতেহার। যেখানে বলা হয়, ৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল ভৌগোলিক এলাকার ৭ কোটি মানুষের জন্য আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’।
৪ মার্চ ১৯৭১ গণবিক্ষোভে এক দফা দাবি অর্থাৎ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সামরিক জান্তার সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য স্বাধীনতার স্লোগান উচ্চারিত হলো, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন ও গঠিত হলো স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ওই দিন বাংলার জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ডাক দেয় সাংবাদিক ইউনিয়ন। তারা মিছিল, জনসভার মাধ্যমে সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ৬ মার্চ সভা-সমাবেশ-মিছিলে সমগ্র বাংলা অধিকতর উত্তাল রূপ ধারণ করে। ঢাকায় ষষ্ঠ দিনের মতো হরতাল পালনকালে সর্বস্তরের জনতা রাস্তায় নেমে আসে। বেলা ১১টায় সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। ওই সময় পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদি নিহত ও ৩০ জন আহত হয়।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভায় বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার অবিনাশী বার্তা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার একটি নিবন্ধে ৭ মার্চ সম্পর্কে বলেন, ‘৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা, আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো।’ ১০ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রাম পরিষদের যুক্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত প্রতিটি মুক্তিসেনাকে সকল প্রকার সাহায্য করার অনুরোধ জানানো হয় এবং পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের আসতে না দিলে বিমানবন্দরে চেকপোস্ট বসিয়ে অবাঙালিকে দেশত্যাগ করতে না দেওয়ার হুমকি প্রদান করা হয়।
১১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় আসতে রাজি আছেন মর্মে তারবার্তা পাঠান। ১২ মার্চ সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে সারা আলীর তোপখানা রোডের বাসায় অনুষ্ঠিত মহিলা পরিষদের সভায় পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। একই দিন লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তি প্রয়োগ নিষ্ফল ও বিপজ্জনক হবে। বহুমাত্রিক ঘটনার মধ্য দিয়ে একে একে পার হয় অগ্নিঝরা মার্চের ভয়াল ২৫টি দিন।
গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনরত বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে এ মাসেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ২৫ মার্চ কালরাতে বিশ্ব ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করে লাখ লাখ বাঙালির প্রাণসংহারে মেতে ওঠে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী স্ফুলিঙ্গে রূপান্তর ঘটে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ প্রবাসী সরকার ঘোষিত হয় ও ১৭ এপ্রিল এই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুর, বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ-রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের নেতৃত্বে সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ত্রিশ লাখ শহীদান, দুই লাখ জননী-জায়া-কন্যার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে দুর্ধর্ষ যুদ্ধংদেহি পাকিস্তানি হায়েনাদের শোচনীয় পরাজয়ের পথ ধরে ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজ পতাকার জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। প্রায় তিরানব্বই হাজার সেনাবাহিনীর দানব সদস্যদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
মুক্তিকামী বাঙালি মার্চ মাসকে যথার্থ অর্থে পরম আন্দোলনমুখী করতে না পারলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পাঠ বিলম্বিত হতো অথবা মুক্তির সকল প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই নিঃশেষ হয়ে যেত। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম পরিক্রমায় ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি কখনও অন্যায়-অসত্যের কাছে নতি স্বীকার করেনি।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।