
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের দামামা বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় ও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন ও পাল্টা হামলার পর থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল থাকায় সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। একটি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই বৈশ্বিক সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং অবধারিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পগুলোতে যে তীব্র জ্বালানি সংকট, বিশৃঙ্খলা এবং হাহাকার আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ফসল নয়; বরং এর পেছনে আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শিতার চরম ঘাটতিও সমানভাবে দায়ী।
রাস্তাঘাটে এখন কান পাতলেই সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে পেট্রলপাম্পের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন তারা দেখতে পান পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে, তখন তাদের ক্লান্তি, বিরক্তি ও ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। অনেক স্থানেই পরিস্থিতি এতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে যে, ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে বাগবিতণ্ডা শেষ পর্যন্ত হাতাহাতি বা হস্তযুদ্ধে গিয়ে রূপ নিচ্ছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনকে যেমন স্থবির করে দিচ্ছে, তেমনি তাদের মনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি মাসেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। বর্তমানে আমদানির পেছনে সরকারকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি এলএনজি আমদানিতেও অতিরিক্ত আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এমনিতেই নানা কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে, তার ওপর বিশ্ববাজারে জ্বালানির এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিপাকে ফেলে দিয়েছে। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ ২৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় এবং গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারায় অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুতের দাম প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর যে প্রস্তাব বিবেচনা করছে, তা সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, গত বছরের তুলনায় এবার দেশে বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মূলত এই চলমান সংকটের জন্য মানুষের আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনা এবং একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুতদারি ও কালোবাজারিকে দায়ী করেছেন। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে ১৪ দিনের ডিজেল, ৯ দিনের অকটেন এবং ১১ দিনের পেট্রলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে এই মজুত দিয়ে মার্চ মাসে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের মধ্যে যখন এমনিতেই প্রবল উদ্বেগ ছিল, তখন ঈদের দীর্ঘ ছুটির আগে রেশনিং প্রথা তুলে নেওয়া, সরকারি ডিপো থেকে দুই দিন তেল সরবরাহ বন্ধ রাখা এবং ব্যাংক বন্ধ থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোর পে-অর্ডার জমা দিতে না পারার মতো ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বাজারে যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের কেনাকাটা বেড়ে যাওয়াটা একটি খুব স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া। এই বিষয়টি আগে থেকে অনুধাবন করে সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারাটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি বড় ব্যর্থতা।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন অত্যন্ত যৌক্তিক এবং প্রণিধানযোগ্য একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ড. ইজাজ হোসেন স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সরকার যতই দাবি করুক সংকট নেই, বাস্তবে জনগণকে যদি ভোগান্তি পোহাতে হয়, তবে বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও বড় ধরনের কোনো ঘাপলা রয়েছে। বিষয়টি দ্রুত উদঘাটন করে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. ইজাজ হোসেন। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ফিলিপাইনের মতো দেশ যদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে, তবে আমাদেরও প্রকৃত বাস্তবতা জনগণের সামনে তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পিছপা হওয়া উচিত নয়।
সংকটের এই সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র যেভাবে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারিতে মেতে উঠেছে, তা রীতিমতো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর এবং শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ তেল জব্দ করেছে এবং মজুতদারদের জরিমানা করেছে। সরকার অবৈধ মজুতদারদের তথ্য দিলে পুরস্কারের যে ঘোষণা দিয়েছে এবং তদারকির জন্য যে ভিজিলেন্স টিম গঠন করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এই নজরদারি শুধু সাময়িক অভিযান নয়, বরং একটি স্থায়ী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল তেল সরবরাহের অভিযোগ তুলেছেন। সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এইভাবে চলতে থাকলে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরারও আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং দেশবাসীকে প্রকৃত তথ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে শনিবার একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে, যা এই মুহূর্তে জনমনে আস্থা ফেরাতে অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।
এই যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় কতটা নগণ্য। বিগত সরকারগুলোর এই খাতের প্রতি অবহেলার কারণেই আজ আমাদের এই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ডিজেল আনা, নুমালীগড় থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির যে বহুমুখী উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা আপৎকালীন স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
সংকটকে পুঁজি করে কেউ যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নজরদারি থাকতে হবে। শুধু আশ্বাসের বাণী নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মজুত, আমদানি ও সরবরাহের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমেই কেবল এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সাশ্রয়ী হতে হবে, কারণ সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সংকট থেকে কোনোভাবেই উত্তরণ সম্ভব নয়।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।