সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মহেশখালীর কোহেলিয়া সেতুতে টোল আরোপের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, এলাকাবাসীর মানববন্ধন

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ | প্রকাশিতঃ ৩০ মার্চ ২০২৬ | ৩:১৬ অপরাহ্ন


কক্সবাজারের মহেশখালী কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ৮৯৫ মিটারের একটি নান্দনিক সেতু। দেশের একমাত্র ব্যয়বহুল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সেতুটি তৈরি করা হলেও, ২০২৪ সালের ২৮ মে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রতিনিধি ও কক্সবাজার-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক জনগণের চলাচলের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অপরিপূর্ণ অবস্থাতেই সেতুর দুই পাশ খুলে দেন। এর ফলে উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি লাঘব হয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। এই সুযোগে যানবাহন চালকেরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে শুরু করলেও, কালারমারছড়ার আফজলিয়া পাড়া হতে ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি যাওয়ার রাস্তা সহজ হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরাও বিনা অভিযোগে এই সড়ক ও সেতুর সুবিধা ভোগ করতে থাকেন।

তবে সম্প্রতি এই সেতুর ওপর বর্তমান সরকার পথশুল্ক বা টোল আরোপের সিদ্ধান্ত জানালে মহেশখালী উপজেলার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকারের প্রতি অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মহেশখালীর সচেতন নাগরিকেরা। এ বিষয়ে রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুমুল সমালোচনা করেছেন মহেশখালীর অনেক নেটিজেন, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

ধলঘাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রহিমের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে ক্ষমতাচ্যুত সরকার মহেশখালীর মানুষের ওপর জুলুম করেছে এবং কেড়ে নিয়েছে ভিটেমাটি, যার ফলে জীবিকা সংকটেও পড়েছেন অনেকে। আব্দুর রহিম আরও বলেন, নতুন সরকারও যদি টোলের নামে অন্যায্য বোঝা চাপিয়ে দেয়, তবে তাঁরা কোথায় যাবেন। জনগণের ওপর অনৈতিকভাবে টোলের বোঝা চাপিয়ে দিলে মানুষ আর এই সড়ক ব্যবহার করবে না। ফলে ধলঘাটা ও মাতারবাড়ির সাথে মহেশখালীর মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, কারণ এই সড়ক ছাড়া মহেশখালী প্রধান সড়কের সাথে একত্রীকরণের আর কোনো রাস্তা নেই।

মাতারবাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, আফজলিয়া পাড়ার মীর আকতার সড়ক ও কোহেলিয়া সেতুর কারণে ধলঘাটা মাতারবাড়ির অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে। হাবিবুর রহমান জানান, চিথাখোলা হতে রাজঘাট ব্রিজ পর্যন্ত পুরোনো যে রাস্তা আছে, তা সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তাহলে এই দুই অঞ্চলের মানুষ কোন পথ ব্যবহার করে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখবে, সেই প্রশ্ন তুলে হাবিবুর রহমান বলেন, পথশুল্কের নামে সরকার যে হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা থেকে অচিরেই সরে আসা দরকার; নয়তো এই সরকারের বিরুদ্ধেও মহেশখালীর মানুষ আন্দোলন শুরু করবে।

এদিকে কোহেলিয়া সেতুর ওপর আরোপিত সম্ভাব্য টোল বন্ধ করতে ‘মহেশখালী জন-সুরক্ষা মঞ্চ’ ও ‘আমরা মহেশখালী’—এই দুই ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন মহেশখালীর সাংবাদিক, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মানববন্ধনে মাতারবাড়ির বিএনপি নেতা হামেদ হোছাইন খোকা বলেন, মাতারবাড়ি-ধলঘাটাবাসী জমি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর ওপর চলাচলে অন্যায়ভাবে টোল চাপিয়ে দিলে তা মেনে নেওয়া হবে না। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজনে আরও বৃহৎ পরিসরে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন হামেদ হোছাইন খোকা।

উপকূলীয় উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি ও কর আইনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, কোহেলিয়া সেতুর ওপর টোলবক্স বসিয়ে কর আদায় করা তাঁদের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের সমান। রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ এবং সরকারের জন্য সবকিছু দিয়েছেন। অনেক ধৈর্য ধরেছেন, আর ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে সরকারকে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানান রফিকুল ইসলাম।

অন্যদিকে মহেশখালীর সাংবাদিক সৈয়দুল কাদের বলেন, কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুতে এখনো টোল আদায় শুরু হয়নি, প্রস্তুতি চলছে। এই সেতু দিয়ে গভীর সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন পণ্য পরিবহন হবে। এ ছাড়া কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে এই সেতু ব্যবহৃত হবে। তাই সেতুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সৈয়দুল কাদের জানান, বিপুলসংখ্যক গাড়ি এই সেতু দিয়ে পারাপার হবে এবং একটি দেশ চালাতে রাজস্ব আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরভাবে রাজস্ব আদায় হলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় জানিয়ে সৈয়দুল কাদের আরও বলেন, বৈদেশিক ঋণ কিংবা দেশীয় অর্থে নির্মিত যেকোনো স্থাপনা থেকে রাজস্ব আদায় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই এই সেতু দিয়ে চলাচলকারী গাড়ি থেকে টোল আদায় করা আপত্তিজনক কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মহেশখালী কোহেলিয়া সেতুর ওপর টোল আদায়ের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কক্সবাজার জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, টোল নীতিমালা ২০২৪-এর অনুকূলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনো সেতু ২০০ মিটারের ওপরে হলে সেই সেতু টোল আরোপযোগ্য। যেহেতু কোহেলিয়া সেতু ৮৯৫ মিটার দীর্ঘ, সেহেতু এটিও টোল বা পথশুল্ক আরোপযোগ্য। সেই আলোকেই কোহেলিয়া সেতুর ওপর পথশুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে সওজ। জনগণ টোল আরোপের বিষয়ে আপত্তি তুলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানান, মহেশখালীতে এ বিষয়ে একটি বৈঠক রয়েছে; সেখান থেকে পরবর্তী কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।