
বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের বরাত দিয়ে জানান, দেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বুধবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের (কুমিল্লা-৯) প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের হিসাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি সম্পাদন ও বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অপর ৭টি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মামলাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবার এবং সামিট গ্রুপ।
এসব মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত আদালত ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচারকারীদের তালিকা প্রস্তুত ও শাস্তির বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই তালিকা তৈরির দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, অতীত সরকারের মতো জোরজবরদস্তি না করে বর্তমান সরকার দেশের প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে বিচার করতে চায়, যাতে কেউ ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।
এদিকে, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের (পটুয়াখালী-৪) এক প্রশ্নের জবাবে ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এই কার্ড পরিবারের নারী প্রধানকে দেওয়া হবে, যার ফলে সহায়তাটি সরাসরি খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার ৩টি করপোরেশন বা ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে এবং আগামী চার বছরের মধ্যে চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের সুবিধাভোগীরা মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। পর্যায়ক্রমে প্রতিমাসে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নাকচ করে তিনি বলেন, সরকার টাকা ছাপিয়ে এই সহায়তা দিচ্ছে না। প্রান্তিক মানুষের হাতে যাওয়া এই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতেই ব্যয় হবে, যা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।