সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ফটিকছড়িতে নদীগর্ভে বিলীনের পথে দেড়শ বছরের পুরোনো মন্দির

এস এম আক্কাছ | প্রকাশিতঃ ২ এপ্রিল ২০২৬ | ১:১৩ অপরাহ্ন


একসময় পুরো এলাকায় এটিই ছিল প্রার্থনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সারা বছরই পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকত মন্দির প্রাঙ্গণ। একের পর এক ধর্মীয় উৎসবে মেতে উঠতেন শত শত সনাতন ধর্মাবলম্বী। সুদৃশ্য এই মন্দিরকে ঘিরে গোটা এলাকায় বয়ে যেত প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু সময়ের নির্মম বিবর্তনে সেসব আজ কেবলই স্মৃতি। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো সেই জাঁকজমকপূর্ণ মন্দিরটি এখন জরাজীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী। প্রমত্তা হালদা নদী ক্রমশ গিলে খাচ্ছে কালের এই নীরব সাক্ষীকে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরি ইউনিয়নে মন্দিরটির অবস্থান। জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে গুরুদাশ শীল নামের এক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) থাকাকালীন এই ইউনিয়নটি গঠিত হয়। এর আগে রোসাংগিরি ও সমিতিরহাট মিলে একটি অবিভক্ত ইউনিয়ন ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রোসাংগিরি স্বশাসিত ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই এলাকাতেই নদী ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী নান্দনিক এই মন্দিরটি। যোগাযোগের উন্নতির ফলে এখন প্রধান সড়ক থেকে কয়েক মিনিটেই সেখানে পৌঁছানো যায়।

একসময় এলাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছিল এটি। মন্দির প্রাঙ্গণে ছিল নজরকাড়া জৌলুস। নান্দনিক কারুকাজে ঘেরা মন্দিরটিতে প্রবেশের জন্য রয়েছে একাধিক গোলাকার দরজা, যার দুপাশে শোভা পাচ্ছে মোগল আমলের অপূর্ব নকশা। ভেতরে রয়েছে দুটি পরিপাটি কক্ষ। একটু দূরেই গুরুদাশ শীল ও গঙ্গাদাশ শীলের জরাজীর্ণ বাড়ি। একটা সময় নিয়মিত পূজা-অর্চনার পাশাপাশি এই মন্দির ঘিরে উৎসবের কোনো কমতি ছিল না।

অথচ আজ সেখানে ইট-সুরকি খসে গিয়ে জন্মেছে পরগাছা আর বুনো আগাছা। দরজা-জানালা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। পূজা-অর্চনা তো দূরের কথা, এখন সেখানে মানুষের পা-ই পড়ে না। বিষধর সাপ আর পোকামাকড়ের নিরাপদ আবাসে পরিণত হয়েছে পুরো স্থাপনা। রাক্ষুসে হালদা এরই মধ্যে মন্দিরের পাশের অনেকটা জায়গা গ্রাস করে নিয়েছে। আরেকটু এগোলেই নদীগর্ভে চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে মন্দিরটির শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু। শতবর্ষী এই স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে এ পর্যন্ত কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা শম্ভু কুমার শীল আক্ষেপ করে জানান, “মন্দিরটি ব্রিটিশ আমলের। দাদার মুখে শুনেছি, সে হিসেবে এর বয়স দেড়শ বছরের কাছাকাছি। ঐতিহ্যে ভরপুর মন্দিরটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নদীভাঙন থেকে এটি রক্ষায় কারও কোনো উদ্যোগ নেই। অচিরেই পুরো মন্দির নদীগর্ভে চলে যাওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।”

ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনার বিষয়ে রোসাংগিরি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শোয়েব আল ছালেহীন জানান, “শতবর্ষী এসব ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এটি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”

এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, “পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করা হবে।”