
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে বালুমহাল ইজারা নেওয়ার আড়ালে ১৫-২০ জনের একটি প্রভাবশালী বালুখেকো চক্র চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং ইছাছড়ি এলাকার ছড়াখাল থেকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। ইজারাদাররা কৌশলে সাব-ইজারাদার নিয়োগ দিয়ে এই দাপুটে চক্রের মাধ্যমে ছড়াখালের তীর, পাশের সরকারি খাসজমি ও স্থানীয় কৃষকের কৃষিজমি কেটে বালু লুটের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পরিবেশের চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। নির্বিচার এই বালু উত্তোলনের ফলে উত্তর হারবাং ইছাছড়ি ও আশপাশের এলাকার ফসলি জমি ক্ষতবিক্ষত হয়ে রীতিমতো পুকুরে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে ভূমিধস দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশবিধ্বংসী এই বালু উত্তোলনের জেরে ওই এলাকার অন্তত তিনটি গ্রামের একাধিক পরিবারের পাকা ও মাটির বসতবাড়ির দেয়াল ও পিলারের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আতঙ্কে বেশির ভাগ পরিবারের লোকজন ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, গত দুই মাস ধরে উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, ভাণ্ডারির ঢেবা ও কোরবানিয়া ঘোনা গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবহমান হারবাং ছড়া থেকে অবৈধভাবে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে ভূগর্ভের বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দিবা-রাত্রি ব্যবহৃত এসব যন্ত্রের বিকট শব্দে একদিকে যেমন মানুষের ঘুম হারাম হয়েছে, অন্যদিকে ছড়াখালের তলদেশের অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ফুট গভীর থেকে বালু তুলে ফেলার কারণে সেখানে বিশাল গর্ত তৈরি হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, ভাণ্ডারির ঢেবা, কোরবানিয়া ঘোনা ও আশপাশের ছড়াখাল এলাকায় শক্তিশালী মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করায় খালের তলদেশ অস্বাভাবিক গভীর হয়ে গেছে। এমনকি ৫০-৬০ ফুট প্রস্থের এই প্রাকৃতিক ছড়াখাল বর্তমানে কোনো কোনো স্থানে ২০০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, উত্তর হারবাং এলাকায় একাধিক বালুদস্যু সিন্ডিকেট এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা এতটাই দাপটশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। সশস্ত্র সন্ত্রাসী পাহারায় তারা দিনরাত নির্বিঘ্নে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাণহানির আশঙ্কায় পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রশাসন এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সেখানে অভিযান চালানোর আগে কয়েকবার চিন্তা করে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জড়িত বালুখেকো সন্ত্রাসীরা দুই মাস ধরে নির্বিঘ্নে বালু লুট চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বালু পরিবহনে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও ডাম্পার চলাচলের কারণে গ্রামীণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরো এলাকায় ধুলোময় পরিবেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই শারীরিকভাবে মারধরসহ এলাকাছাড়া করা হচ্ছে।
উত্তর হারবাং সাংগঠনিক ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম তাঁর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড় কেটে মাটি লুটের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অবৈধ পন্থায় বালু তোলার কারণে কয়েকটি গ্রামে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। শত শত একর ফসলি জমিতে ভূমিধস হচ্ছে, গ্রামীণ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হারবাং ছড়া থেকে বালু তোলা অব্যাহত থাকলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা ও ব্যাপক ভাঙন শুরু হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
উত্তর হারবাংয়ের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কোরবানিয়া ঘোনার বাসিন্দা প্রবাসী এনামুল হক অভিযোগ করেন, ইছাছড়ি ছড়াখাল থেকে বালু উত্তোলনের কারণে মেশিনের ঝাঁকুনিতে তাঁর নিজের একতলা পাকা বাড়ির দেয়াল ও পিলারে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে ফিরে তিনি এই অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় বালুদস্যুরা তাঁকে হুমকি দিয়ে বলেছে, কোথাও অভিযোগ করলে তাঁর পুরো বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো বলেন, উত্তর হারবাং ইছাছড়ি ছড়াখাল থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে সম্প্রতি চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের একটি দল অভিযান চালিয়ে একটি শ্যালো মেশিন জব্দ করেছিল। কিন্তু প্রশাসন চলে যাওয়ার পর আবারও একই কায়দায় শুরু হয় তাণ্ডব। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে জেলা প্রশাসনকে ওই এলাকার বালুমহাল ইজারা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে।
চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব জানান, উত্তর হারবাং ইছাছড়ি এলাকায় ছড়াখাল থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বালুমহাল ইজারাদাররা সরকারি শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছেন। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ইজারা গ্রহীতারা নিজেরা কাজ না করে সাব-ইজারাদার নিয়োগ দিয়েছেন এবং তাঁরা সরকারি নির্ধারিত জায়গা বাদ দিয়ে ছড়াখালের তীরের ৭-৮টি স্থান থেকে কৃষিজমি কেটে বালু উত্তোলন করে পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধ করেছেন।
সহকারী কমিশনার রুপায়ন দেব আরও জানান, বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে পরিবেশগত সংকটাপন্ন ওই ছড়াখালের দুটি বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার সুপারিশ করে চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ বালু উত্তোলন করলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, ছড়াখাল ও তীরের কৃষিজমি কেটে বালু উত্তোলন বন্ধে এর আগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এবং পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক মো. জমির উদ্দিন সরেজমিন পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।