সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পটিয়ায় চাঁনখালী খালে সেতু নির্মাণে গাফিলতি: এক মাসে দুই নৌকাডুবি, হুমকির মুখে লবণশিল্প

লাল কাপড় টাঙিয়েই পাউবোর দায়মুক্তি, ঠিকাদারের অস্বীকার
রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ৬ এপ্রিল ২০২৬ | ৩:২৫ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের পটিয়া পৌর সদরে অবস্থিত ইন্দ্রপুল লবণশিল্প চরম হুমকির মুখে পড়েছে। চাঁনখালী খালে সেতু নির্মাণকাজে ব্যবহৃত লোহার গার্ডারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এক মাসের ব্যবধানে দুটি লবণবোঝাই নৌকা বা ট্রলার ডুবে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে নৌপথে লবণের কাঁচামাল আনা প্রায় বন্ধ থাকায় ইন্দ্রপুল লবণশিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে সড়কপথে ট্রাকে করে কাঁচামাল আনায় ব্যবসায়ীদের যেমন অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তেমনি সড়কে লবণপানির কারণে পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অবগত করা হলে সেতু নির্মাণ এলাকায় কেবল লাল রঙের কাপড় টাঙিয়ে তারা দায় সেরেছে।

জানা গেছে, পটিয়া ইন্দ্রপুল লবণশিল্প এলাকায় অর্ধশতাধিক লবণ মিল রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগ কাঁচামাল আসে কক্সবাজারের টেকনাফ, মহেশখালী, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে। এসব জায়গা থেকে লবণের কাঁচামাল সড়কপথের চেয়ে নৌপথে পটিয়ায় আনা অনেক সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ। এর একমাত্র পথ চাঁনখালী খাল। কিন্তু পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের নাইখাইন এলাকায় চাঁনখালী খালের ওপর পাউবোর ‘উপজেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প’-এর আওতায় একটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।

পটিয়া ইন্দ্রপুলের লবণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সেতু নির্মাণকাজে ঠিকাদারের গাফিলতির কারণেই এক মাসের ব্যবধানে দুটি ট্রলার ডুবেছে। সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ ব্রিজের পিলার নির্মাণের জন্য পানির নিচে দেওয়া লোহার গার্ডারের সঙ্গে লেগে একটি ট্রলার ডুবে ৮ লাখ টাকার লবণের কাঁচামাল নষ্ট হয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেও একই জায়গায় পানির নিচে থাকা লোহার গার্ডারের সঙ্গে লেগে আরও একটি ট্রলার ডুবে যায়।

ডুবে যাওয়া ট্রলারে থাকা লবণের মালিক আহমদ উল্লাহ জানান, বাঁশখালী থেকে পটিয়া ইন্দ্রপুলে লবণের কাঁচামাল নিয়ে আসার পথে নাইখাইন সেতুর পানির নিচে থাকা লোহার গার্ডারের সঙ্গে লেগে তাঁর এক হাজার ৮০০ মণ লবণের কাঁচামাল নষ্ট হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া ট্রলারের কিছু অংশ ভেঙে গিয়ে আরও প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় কারও কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ না পেয়ে পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

পটিয়া লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক আল্লাই বলেন, বর্তমানে চাঁনখালী খাল হয়ে নৌপথে লবণের কাঁচামাল আনা প্রায় বন্ধ রয়েছে। নাইখাইন এলাকায় সেতু নির্মাণকাজে ব্যবহৃত লোহার আঘাতে ট্রলার ডুবে যাওয়ায় ট্রলারমালিকেরা নৌপথে আসতে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ভরা মৌসুমে কাঁচামাল আনা বন্ধ থাকায় ইন্দ্রপুল লবণশিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়বে। আগে যেখানে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি ট্রলার আসত, এখন পানির জোয়ার থাকলে হাতে গোনা দুই-তিনটা আসছে। কাঁচামাল আনতে বাধাগ্রস্ত হলে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড পটিয়ার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহবুব আলম বলেন, ঘটনার পর ওই স্থানে লাল চিহ্নিত কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেতুটির নির্মাণকাজ গত ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, নাইখাইন এলাকায় সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এমরান হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্টো লবণ মিল মালিকদেরই দোষারোপ করেন। তাঁর সেতুর নির্মাণসামগ্রীতে লেগে ট্রলার ডোবেনি দাবি করে তিনি বলেন, ওই স্থানে নৌকা বা ট্রলার ডোবার কোনো জায়গা নেই। তিনি লবণ মিল মালিকদের ‘ডাকাত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ কারণে তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন। তাঁর দাবি, লবণ মিল মালিকেরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চাপ প্রয়োগ করে কাজ আদায় করে নিতে চাইছেন।