সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে সিয়ামের

ফটিকছড়ি কলেজের ছাত্র সিয়ামের পা বাঁচাতে আকুতি পরিবারের: প্রতিশ্রুতি ভুলেছে প্রাণ-আরএফএল!
এস এম আক্কাছ | প্রকাশিতঃ ৭ এপ্রিল ২০২৬ | ৫:২৯ অপরাহ্ন


১৯ বছর বয়সী এক টগবগে তরুণ ইমরান উদ্দিন সিয়াম। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তিনি। যার দাপিয়ে বেড়ানোর কথা কলেজের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, খেলাধুলায় যার উচ্ছ্বাসে মেতে থাকার কথা পুরো আঙিনা, সেই তরুণের জীবন আজ থমকে গেছে হাসপাতালের একটি বিছানায়। একটি মাত্র দুর্ঘটনা কেড়ে নিতে বসেছে তার স্বাভাবিক জীবন, তাকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর দিকে।

গত ১১ মার্চ সকালের ঘটনা। প্রতিদিনের মতোই সিয়াম তার ব্যবসায়ী চাচা মো. আনোয়ার হোসেনের মোটরবাইক নিয়ে ফটিকছড়ি সদর থেকে সুন্দরপুরের পাঁচপুকুরিয়া গ্রামে নিজেদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানীর একটি বেপরোয়া গতির কাভার্ড ভ্যান তার বাইকটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে মাথা, নাক ও মুখ ফেটে যায় সিয়ামের, থেঁতলে যায় তার বাঁ পা। বিক্ষুব্ধ জনতা দ্রুত ভ্যানটি আটকে ফেলে এবং সিয়ামকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

তার এই করুণ অবস্থা নিয়ে হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান ডা. এস খালেদ জানিয়েছেন, সিয়ামের পায়ে যে ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য দেশে বা বিদেশে অত্যন্ত উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। দ্রুত সেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না গেলে তার পা কেটে কৃত্রিম পা সংযোজন করতে হবে। অন্যথায় পচন ধরে তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

এদিকে ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ভ্যানটি আটকে রাখলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সিয়ামের চাচা মো. আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, এ পর্যন্ত সিয়ামের চিকিৎসায় তাদের প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তিনি নিজেই স্থানীয় পরিবেশক হাবিবের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। পরবর্তীতে হাবিব চট্টগ্রাম ডিপো কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান এর মাধ্যমে সবকিছু অবহিত করেন। কোম্পানির মালিকের সাথে কথা বলে তারা সর্বোচ্চ সহায়তার আশ্বাস দিলেও, এখন তারা বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন এবং প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। সিয়াম এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন।

সিয়ামের বড় ভাই মো. ইমন এক বুক হতাশা নিয়ে বলেন, তাদের অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয়ের উন্নত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। সরকার বা দায়ী সেই বৃহত্তর কোম্পানিটি এগিয়ে এলেই কেবল সিয়ামের উন্নত চিকিৎসা সম্ভব। এই মুহূর্তে অপারেশন করাতে ব্যর্থ হলে তার ভাইকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে।

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল চট্টগ্রামের ডিপো কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, কিছুদিন আগে নাজিরহাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের দাবির অঙ্ক বেশি হওয়ায় কোনো সমাধান আসেনি। তবে তাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব শিগগিরই এই সমস্যার একটি সমাধান হবে।

সার্বিক বিষয়ে নাজিরহাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাহাব উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার পর উভয় পক্ষই সমস্যা সমাধানে বসেছিল, কিন্তু নানা কারণে তা নিষ্পত্তি হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যদি মামলা দায়ের করে, তবে তারা যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এখন সবার একটাই প্রশ্ন— সিয়ামের এই তরুণ জীবন কি একটি বেপরোয়া গাড়ির চাকায় এভাবেই পিষ্ট হয়ে যাবে, নাকি সবার সহযোগিতায় সে আবারও নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে? একবুক স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা সিয়ামের আর্তনাদ যেন শোনার কেউ নেই।