
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আজিজ হাসপাতাল একসময় চাটখিল ও সোনাইমুড়ী এলাকার কয়েক হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা ছিল। ‘আজিজ আমিরুন্নেছা কল্যাণ ট্রাস্ট’-এর আওতায় পরিচালিত হয়ে আসা এই হাসপাতালটি বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে কার্যত সেবাহীন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল পরিচালনাকারী এই ট্রাস্টের বিপুল সম্পদ নিয়েও উঠেছে দখল ও অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ।
জানা যায়, ১৯৮৫ সালে দানবীর মরহুম আলি আশরাফ এই কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে আশরাফ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি একসময় মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করত। স্বল্প খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এক্স-রে ও অপারেশনের সুবাদে এটি সাধারণ মানুষের আস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা আলি আশরাফের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সেই সেবার মান কমতে থাকে। বর্তমানে হাসপাতালটি নামমাত্র চালু থাকলেও বাস্তবে এর অধিকাংশ সেবা বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অপারেশন থিয়েটার অচল, এক্স-রে মেশিন তালাবদ্ধ এবং ল্যাবসেবা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের এমন করুণ অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ট্রাস্টের বিপুল সম্পদ নিয়েও স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের দাবি, ট্রাস্টের নামে ঢাকায় একাধিক বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি থাকলেও সেসব সম্পদের আয়-ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ট্রাস্টের সম্পদকে ব্যক্তিগত মালিকানায় নেওয়ার অপচেষ্টা করছে। ঢাকায় অবস্থিত সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। এর পাশাপাশি হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় ট্রাস্টের গাছপালা কেটে বিক্রি করারও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, অনুমতি ছাড়াই এসব গাছ কাটা হচ্ছিল। এ ঘটনায় এলাকাবাসী বাধা দিলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তবে বাধা উপেক্ষা করেই গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়।
সরেজমিনে কল্যাণ ট্রাস্টের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে পরিচিত সোনাইমুড়ী উপজেলার জুনুদপুরের আশরাফ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গণের অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সেগুলো খণ্ড খণ্ড করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি হাসপাতাল সীমানার দুই পাশের দুটি পুকুরের পানি নিষ্কাশন করে মাছও তুলে নেওয়া হয়েছে।
গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের দায়িত্বে থাকা মান্নান জানান, সোনাইমুড়ীর লোকমান কন্ট্রাক্টর এই গাছগুলো ২৩ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছেন। হাসপাতালের নাইট গার্ড ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতার ভাগনের নির্দেশে গাছগুলো বিক্রি করেছেন। গত চার দিন ধরে তাঁরা গাছ কাটছেন এবং টাকা পরিশোধ করেই গাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মান্নান দাবি করেন।
একসময়ের ঐতিহ্যবাহী এই হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মাত্র একজন চিকিৎসক, দুজন রিসেপশনিস্ট, দুজন নাইট গার্ড, একজন নার্স ও একজন আয়া দিয়ে চলছে হাসপাতালের সব কার্যক্রম। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত শুধু হাসপাতালে সেবাদান চলে। এক্স-রে মেশিন থাকলেও সেটি তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। ডায়াগনস্টিক ল্যাবে সেবা দেওয়া হয় শুধুই নামের মাত্র।
ট্রাস্টের জুনুদপুর কেন্দ্রীয় অফিসে গিয়ে কোনো কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। সেখানে দায়িত্বরত হাসপাতালের চিকিৎসক মো. মিজানুর রহমান নয়ন জানান, তিনি হাসপাতালে আগত রোগীদের কেবল প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে থাকেন। ৬০ হাজার টাকা বেতনে গত এক বছর ধরে তিনি এই হাসপাতালে কর্মরত আছেন। ঢাকা থেকে রেজাউল করিম রন্টু নামের একজন তাঁকে এই বেতন পাঠান। তবে কীভাবে এই ট্রাস্ট পরিচালিত হচ্ছে বা কারা পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন—এ বিষয়ে চিকিৎসক মো. মিজানুর রহমান নয়ন কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাসপাতালটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং এলাকার সাধারণ মানুষ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হারাবে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত তদন্ত করে ট্রাস্টের সম্পদ রক্ষা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আশরাফ হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন।