সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কালবৈশাখীর আঘাতে লণ্ডভণ্ড চকরিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, চরম ভোগান্তি

এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৫ অপরাহ্ন


মঙ্গলবার ভোররাত এবং বুধবার দিবাগত রাতে দুই দফায় কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে ও হেলে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার রাত নয়টা পর্যন্ত উপজেলার বেশির ভাগ ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক কমবেশি বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রেখেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো বা পিডিবি)।

অপরদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীনে চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ফাঁসিয়াখালী ও পূর্ব বড় ভেওলার আংশিক ইউনিয়ন ছাড়া অপর ১৬টি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু দুই দিন ধরে ভেঙে পড়া ও হেলে পড়া খুঁটি পুনরায় স্থাপন করার কাজ চললেও বেশির ভাগ এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করতে পারেননি পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা।

চকরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিলীপ দে জানান, দুই দফায় কালবৈশাখী ঝড়ে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও গাছের ডালপালা ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাবেই ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভোররাত ৩টা থেকে বুধবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজের মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার মানুষ। বিদ্যুৎনির্ভর বেশির ভাগ দোকানপাট এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো), চকরিয়া বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ এবং কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চকরিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কালবৈশাখীর প্রভাবে মঙ্গলবার ভোররাত থেকে তীব্র গতির বাতাসে চকরিয়া পৌরশহর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছের ডালপালা ভেঙে বিদ্যুতের সংযোগ লাইনের ওপর পড়ে। এতে বিদ্যুতের পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে, হেলে পড়েছে আরও ২৯টি খুঁটি এবং পাঁচটি ট্রান্সফরমার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় দুই শতাধিক স্থানে সঞ্চালন লাইনের তার ছিঁড়ে গেছে। চকরিয়া ও লামা উপজেলার কিছু অংশজুড়ে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ৯৭ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। অন্যদিকে, বিপিডিবির আওতাধীন চকরিয়া পৌরসভা, ফাঁসিয়াখালী, চিরিংগা, সাহারবিল, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা ও পূর্ব বড় ভেওলার বিভিন্ন এলাকায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা এলাকায় বিপিডিবির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত এসব লাইন সচল করতে উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন।

বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয় জনসাধারণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের ইলিশিয়া এলাকার বাসিন্দা ও সাংবাদিক কাদের নেওয়াজ বলেন, গত মঙ্গলবার ভোররাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। এখন বাড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনে যেমন-তেমন, রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঠিকমতো ঘুমাতেও কষ্ট হচ্ছে।

বদরখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নুরে হাবিব তছলিম অভিযোগ করে বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ের পর দুই দিন ধরে বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। ফ্রিজে থাকা মাছ-মাংস নষ্ট হয়ে গেছে। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতির কারণেই গ্রাহকেরা যথাসময়ে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না বলে তিনি দাবি করেন।

চকরিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা এম সোহেল মাহমুদ বলেন, মঙ্গলবার ভোররাতে বিদ্যুৎ চলে গেছে, সেই থেকে বাড়িতে আর বিদ্যুৎ নেই। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হলেও বাস টার্মিনাল এলাকাটি ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। বিউবো চকরিয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সরকারি মোবাইলে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করছেন না। কবে নাগাদ বিদ্যুৎ আসবে তার কোনো তদারকি নেই। এমন প্রেক্ষাপটে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

সার্বিক বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের চকরিয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোহাম্মদ এমরান গনি বলেন, দুই দফায় কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে সড়কের পাশে গাছপালা উপড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর পড়েছে। এতে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় একাধিক খুঁটি ভেঙে গেছে ও প্রায় ২০০ স্থানে তার ছিঁড়ে গেছে। লাইনম্যান ও ঠিকাদারের কর্মীরা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ চালু করা হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে বৃহস্পতিবারের মধ্যে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

বিপিডিবির চকরিয়া বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, দুই দফার কালবৈশাখী ঝড়ে চকরিয়া পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বৈদ্যুতিক খুঁটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বেশির ভাগ এলাকায় ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

চকরিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে দুই দফায় কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকসংখ্যক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কের গাছপালা ভেঙে একাধিক স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়েছে এবং কিছু কিছু এলাকায় খুঁটি ভেঙেও গেছে। রুপায়ন দেব আরও জানান, পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক খুঁটি পুনরায় স্থাপন করে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করতে তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন।