সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ট্রাম্প-ইরান শান্তিচুক্তি কি ভেস্তে যাচ্ছে?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৯ এপ্রিল ২০২৬ | ৯:৫০ পূর্বাহ্ন


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া শর্তের ওপর আলোচনায় রাজি হয়েছেন। শান্তিচুক্তির জন্য পাকিস্তানে আগামীকাল শুক্রবার থেকে আলোচনা শুরু হচ্ছে। এই আলোচনা থেকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আসবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির রূপরেখা নিয়ে দুই পক্ষ দুই মেরুতে অবস্থান করায় অনেক প্রশ্নই অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ লিখেছেন, উভয় পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বোঝাপড়ার পরিচয় দিয়েছে। এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে দুই পক্ষই গঠনমূলক আলোচনায় যুক্ত হচ্ছে।

যেসব বিষয়ে সম্মত হওয়া গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের সামরিক লক্ষ্যগুলো ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং এই প্রণালি নিরাপদ রাখারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানও এই যুদ্ধে নিজেদের বিজয় দাবি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁরা ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছেন। এই প্রস্তাব আলোচনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত ভিত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, অতীতের বিরোধপূর্ণ প্রায় সবগুলো বিষয় নিয়েই দুই পক্ষ সম্মত। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে এ বিষয়ে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং এটি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধবিরতির জন্য আগে ১৫ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান। সর্বশেষ পাকিস্তানের হাতে নিজেদের ১০ দফা প্রস্তাব তুলে দেয় তারা। এই ১০ দফা প্রস্তাবের ওপরই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের দেওয়া সেই ১০ দফার মধ্যে রয়েছে—ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন না চালানোর চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি, ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত জাহাজ চলাচল (এর অর্থ হলো প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা), ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির স্বীকৃতি এবং ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে উত্থাপন করা সব প্রস্তাবের প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সব মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সব সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের টোল থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও রয়েছে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো অনুমোদনের দাবিও জানিয়েছে ইরান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলেও বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ-ও বলেছেন, যেকোনো শান্তিচুক্তিতেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুতের বিষয়টি সুরাহা করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই বিষয়টি নিখুঁতভাবে সমাধান করা হবে, না হলে তিনি এই চুক্তির আলোচনায় আসতেন না। ইরান অবশ্য বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে নিজেদের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে তারা প্রস্তুত।

তবে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যে ১০ দফা পরিকল্পনার কথা ফাঁস করেছেন, তা মূল আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যদি আলোচনা ফলপ্রসূ না হয়, তবে তাঁরা খুব সহজেই আবারও যুদ্ধে ফিরে যাবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। এ ছাড়া ইরানের দেওয়া শর্তের মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ থাকা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না। ফলে এসব বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যাচ্ছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতিকে ইসরায়েল সমর্থন জানালেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাঁদের লড়াই বা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এই চুক্তির আওতায় পড়বে না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল এই আগ্রাসন চালিয়ে গেলে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। তবে যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-বিষয়ক লেখক ও ইরানি বংশোদ্ভূত সুইডেনের নাগরিক ত্রিতা পার্সি মনে করেন, ইসলামাবাদে হতে যাওয়া এই আলোচনা ব্যর্থও হতে পারে, তবে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। ত্রিতা পার্সি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা ম্লান হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওয়াশিংটন এখনো হয়তো তাদের তলোয়ার ঘোরাতে পারে, কিন্তু একটি ব্যর্থ যুদ্ধের পর এমন হুমকি ফাঁপা শোনায়। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই বলে ত্রিতা পার্সি মত দেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে তাঁদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ রাখবে। এর পরপরই ইরাকে থাকা ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও আগামী দুই সপ্তাহের জন্য ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে তাদের হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ১৪ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

আর বার্তা সংস্থা এপি একটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইরান ও ওমান উভয়েই টোল আদায় করতে পারবে, যা মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। তবে ওমান বলেছে, তারা টোল আদায় করবে না। ওমানের পরিবহনমন্ত্রী সাইদ বিন হামুদ বিন সাঈদ আল মাওয়ালি বলেছেন, তাঁরা এমন সব সামুদ্রিক পরিবহন চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো মাশুল না নেওয়ার বিধান রয়েছে।