
হলুদ খামের চিঠি, ডাকপিয়নের সাইকেলের টুংটাং শব্দ আর প্রিয়জনের হাতের লেখার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা—এসব এখন কেবলই সোনালি অতীতের স্মৃতি। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে যোগাযোগের মাধ্যম এখন মুঠোফোনের স্ক্রিনে বন্দি। একসময়ের আবেগ আর ভালোবাসার নীরব সাক্ষী ডাকঘরগুলোতে এখন আর প্রিয়জনের চিঠি আসে না। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ডাকঘরগুলোতে কান পাতলে এখন কেবলই শোনা যায় বিবাহ বিচ্ছেদ, আদালতের সমন আর ব্যাংকের পাওনা আদায়ের নীরস নোটিশের গল্প।
আবেগের জায়গা নিয়েছে যান্ত্রিকতা
মিরসরাই উপজেলায় ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় ৭টি বিভাগীয় ডাকঘর এবং এর অধীনে ৩২টি উপ-ডাকঘর রয়েছে। করেরহাট, জোরারগঞ্জ, মহাজনহাট, বড়দ্বাজহাট, বিশ্বদরবার, আবুতোরাব ও কমলদহ—এই ডাকঘরগুলোর চিত্র এখন প্রায় অভিন্ন। আগে যেখানে পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠির ছড়াছড়ি ছিল, আজ সেখানে শুধুই যান্ত্রিক আর আইনি কাগজপত্রের স্তূপ।
মিরসরাই উপজেলা বিভাগীয় ডাকঘরের হিসাব বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ আসে এখানে। এছাড়া জায়গা-জমি সংক্রান্ত আদালতের চিঠি আসে ৫০টির মতো, শিল্প প্রতিষ্ঠানের চিঠি ২০০ থেকে ২৫০টি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চিঠি আসে ৩৫০ থেকে ৪০০টি। এর বাইরে অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম দারাজের কল্যাণে দিনে গড়ে ১০টির মতো পার্সেল বিলি হয়। সঞ্চয়পত্রের লেনদেন করতে আসা গুটিকয়েক গ্রাহক ছাড়া একসময়ের জনবহুলে ঠাসা ডাকঘরগুলো এখন একেবারেই নীরব। উপ-ডাকঘরগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। সারাদিন খোলা রাখলেও গ্রাহকের দেখা মেলে না, কাজ না থাকায় পিয়নরাও নিয়মিত আসেন না।
স্মৃতির পাতায় চিঠির যুগ
উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ওবায়দুল হক চিঠির যুগের কথা স্মরণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তার দুই ছেলে প্রায় ৩৫ বছর ধরে প্রবাসে আছেন। একসময় চিঠির মাধ্যমেই তাদের খোঁজখবর নিতেন তিনি। দেশ থেকে চিঠি পাঠানোর পর বিদেশ থেকে ডাকবিভাগের মাধ্যমেই উত্তর আসত। মাসে অন্তত দু-একবার তাকে ডাকঘরে যেতেই হতো। অথচ গত ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে তিনি আর ডাকমুখো হননি। এখন তো ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রতিদিনই ছেলেদের সাথে তার কথা হয়।
একইভাবে আক্ষেপ ঝরে পড়ে কবি ও সাংবাদিক দিদারুল আলম ভূঁইয়ার কণ্ঠে। স্কুলজীবন থেকে লেখালেখির অভ্যাস তার। সেই সময় ডাকবিভাগের মাধ্যমেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠাতেন তিনি। বিনিময়ে ডাকযোগে আসত বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও সাহিত্য পত্রিকা। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও কুরিয়ার সার্ভিসের দাপটে সেসব এখন শুধুই স্মৃতি।
পোস্টমাস্টারদের বয়ানে বর্তমানের চিত্র
কমলদহ ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মহিউদ্দিন টিপু জানান, সরকারি চিঠি, চাকরির চিঠি, প্রতিষ্ঠানের নোটিশ আর বিবাহ বিচ্ছেদের চিঠি ছাড়া এখন আর কিছুই আসে না। আগের সেই কর্মব্যস্ততা এখন উধাও। তবে অন্য ডাকঘরের তুলনায় তার এখানে ডকুমেন্টস কিছুটা বেশি আসে।
আবুতোরাব ডাকঘরের পোস্টমাস্টার গোপাল চন্দ্র নাথ জানান ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার কথা। তার ডাকঘর এলাকায় জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছু চিঠি আসে। এর পাশাপাশি আসে বিবাহ বিচ্ছেদ ও ব্যাংকের নোটিশ। বিদেশ থেকে কবে সর্বশেষ চিঠি এসেছে, তা তিনি নিজেই ভুলে গেছেন।
মিরসরাই উপজেলা ডাকঘরের মাস্টার আসাদুজ্জামান খান অবশ্য কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ে ডাকবিভাগের সুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, ডাকবিভাগের সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে, যেখানে অনেক কুরিয়ার সার্ভিস এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাছাড়া কুরিয়ারের তুলনায় ডাকবিভাগে খরচও অনেক কম। তা সত্ত্বেও মানুষ এখন কুরিয়ার সার্ভিসের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই প্রবল স্রোতে ডাকঘরগুলো টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে গেছে চিঠির সেই পুরোনো আবেদন। লাল রঙের ডাকবাক্সগুলো যেন আজ নীরবে দাঁড়িয়ে কেবল যান্ত্রিক আর আইনি নোটিশের ভার বহন করে চলেছে।