সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

এমপির কড়া হুঁশিয়ারির পরও মিরসরাইয়ে থামছে না পাহাড় কাটা

পাহাড় কাটতে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যু: প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মাসোহারা দিয়ে চলছে মাটিবাণিজ্য!
এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ৯ এপ্রিল ২০২৬ | ৮:৩৪ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় একের পর এক পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। দিনরাত বিক্রি হচ্ছে শত শত ট্রাক মাটি। পাহাড়খেকোরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পরিবেশবাদী ও স্থানীয়রা পরিবেশ রক্ষায় পাহাড় কাটা বন্ধের প্রতিবাদ জানালেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। গত ১৬ মার্চ মিরসরাই উপজেলার অলিনগরে পাহাড় থেকে বালু উত্তোলনের সময় পাহাড়ধসে জামশেদ আলম নামের এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এসব পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত। প্রতি রাতে পিকআপভর্তি করে মাটি বিক্রি করছে পাহাড়খেকোরা। অবৈধভাবে দীর্ঘদিন পাহাড় কেটে বাড়িঘর তৈরি করে আসছে তারা। সবুজ প্রকৃতিঘেরা এই এলাকায় অবাধে পাহাড় কাটার ফলে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী পাহাড়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, এলাকার কিছু পাহাড়খেকো নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি খাস মালিকানাধীন পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি করছে। এ ছাড়া পাহাড় কেটে সেই মাটি দেদারসে বিক্রির মাধ্যমে তারা রাতারাতি ধনী বনে যাচ্ছে। এদিকে পাহাড়গুলো কেটে সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি গোটা এলাকার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

গণহারে পাহাড় কাটার ফলে বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি। বর্ষাকালে কাটা পাহাড় ধসে পড়ে মানুষ, ঘরবাড়ি ও রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। পাহাড়ে থাকা গাছ, পাখি, বন্য প্রাণী ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে অনেক প্রাণী এলাকা ছেড়ে যাবে বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ২ নম্বর হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী এলাকায় দিনদুপুরে পাহাড় কাটছে একটি চক্র। শুধু পূর্ব হিঙ্গুলী নয়, সাইবেখিল, ঘোড়ামারা, কয়লা, বদ্ধভবানি, জিলতলী ও মেহেদীনগর এলাকায়ও দেদারসে পাহাড় কাটা হচ্ছে।

মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন পাহাড় কাটার বিষয়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিলেও কোনোভাবেই পাহাড় কাটা রোধ করা যাচ্ছে না। সংসদ সদস্য নুরুল আমিন দলীয় নেতা-কর্মীদের পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন ও জমির মাটি কেটে বিক্রি থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সংসদ সদস্য নুরুল আমিনের কথা অমান্য করে বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, দক্ষিণ অলিনগরে বালু উত্তোলনের সময় চাপা পড়ে শ্রমিক জামশেদ আলম মারা গেলেও এর নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। শুধু আকবরনগর নয়, করেরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

গত ১৬ মার্চ মিরসরাই উপজেলার দক্ষিণ অলিনগরে পাহাড়ে মাটি কাটার সময় হঠাৎ পাহাড় ধসে পড়ে তিন শ্রমিক চাপা পড়েন। এ সময় উপস্থিত অন্য শ্রমিকরা দ্রুত মাটি সরিয়ে তাঁদের উদ্ধার করতে গেলে দেখতে পান জামশেদ আলম মারা গেছেন। জীবিত ও আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অন্য দুই শ্রমিককে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৫ আগস্ট থেকে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতারা থানা-পুলিশ, প্রশাসন ও কিছু অসাধু সাংবাদিককে মাসোহারা দিয়ে পাহাড় কেটে বালু ও মাটি বিক্রি করে আসছেন। মাটি বহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের কারণে সড়ক ভেঙে গিয়ে তা জনসাধারণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ অবৈধভাবে এ কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান নিশ্চিত করেন।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, কোথাও পাহাড় কাটার খবর পেলে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যাচ্ছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার জানান, সম্প্রতি করেরহাটে পাহাড় কাটার দায়ে লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মাননীয় সংসদ সদস্য নুরুল আমিনের নির্দেশে পাহাড় কাটার বিষয়ে প্রশাসন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। যাঁরা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার জানান।