সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম পরীক্ষা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪৫ অপরাহ্ন


বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি প্রথম পরীক্ষা হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ভারতের টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বিষয়ে এই মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) এনডিটিভিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়।

সদ্য ভারত সফর শেষ করে মরিশাসে গিয়ে এই সাক্ষাৎকারটি দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে গত ৯ ও ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দিতে তখন মরিশাসে অবস্থান করছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

মরিশাসে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ভারত সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গে দেখা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তি চলমান থাকা অবস্থায়ই বাংলাদেশের দিক থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানি না পাওয়ার অভিযোগ ছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে কিংবা নতুন চুক্তি করতে হবে।

দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই চুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, গঙ্গার পানির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা বাঁচা-মরার। বাংলাদেশের পুরো সভ্যতা ও জীবিকা গঙ্গার পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ একটি সংশোধিত চুক্তি দেখতে চায়, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান উল্লেখ করেন।

পানি বণ্টন যথাযথ না হলে বাংলাদেশের জীবিকা, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বিরূপ প্রভাব পড়বে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, যেহেতু দুই দেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী, এমন এক প্রেক্ষাপটে ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক করার জন্য প্রথম পরীক্ষা।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন গঙ্গার পানি চুক্তি সম্পন্ন হয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তলানিতে ঠেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। এর আগে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই ভিসা প্রদান সীমিত করেছিল। দিল্লির আলোচনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে ভিসার প্রসঙ্গ এসেছিল কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভিসার সমস্যা দুই দেশেই ছিল। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিনের মধ্যে ভারতের সব ধরনের নাগরিকের জন্য ভিসা চালু করেছে। ভারতও একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে, এমন আশা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা ভিসার ওপর নির্ভর করেন। যখন ওই ভিসা পাওয়া বিঘ্নিত হলো, মানুষ তখন বিকল্প খুঁজতে শুরু করল। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটা সুতা ছিঁড়ে গেল বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করলে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে—এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভারত কিংবা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু এক পক্ষের লাভের নিরিখে পরিচালিত নয়। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য– দুটোই বাজারভিত্তিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে থাকে। যেখানে বাংলাদেশ ভালো মূল্য পায়, সেখানেই বাংলাদেশ যায় বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট করেন।

বাসস জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মরিশাসে চলমান ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনের ফাঁকে গত শুক্রবার মরিশাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আঞ্চলিক সমন্বয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রী ধনঞ্জয় রামফুলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও মরিশাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ধনঞ্জয় রামফুলের মধ্যে এ সময় দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেমে গেলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট পুরোপুরি শেষ হবে না বলে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত শুক্রবার মরিশাসে অনুষ্ঠিত নবম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে (আইওসি) বক্তব্য দেওয়ার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই আহ্বান জানান।