সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ফুলের স্রোতে পুরোনোকে বিদায়, খাগড়াছড়িতে বৈসাবির রঙিন সূচনা

শ্যামল রুদ্র | প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৫২ অপরাহ্ন


পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের রঙিন ঋতু। প্রকৃতি আর মানুষের অপূর্ব মিলনে খাগড়াছড়ি যেন পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত উৎসবমঞ্চে। রবিবার (১২ এপ্রিল) ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতে না ফুটতেই চেঙ্গী নদীসহ আশপাশের খাল-ছড়ায় ভাসতে শুরু করে রঙিন ফুলের ঢেউ। গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন আর ভক্তিপূর্ণ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সূচনা হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবির, যার প্রথম দিনটি চাকমাদের ভাষায় ‘ফুল বিজু’ নামে পরিচিত।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নদীর জলে ফুল ভাসানোর এই আচার কেবল একটি সাধারণ রীতি নয়; বরং এটি পুরোনো বছরের সব দুঃখ-বেদনা, গ্লানি আর অশুভ শক্তিকে চিরতরে বিদায় জানানোর এক প্রতীকী প্রকাশ। নতুন বছরের প্রারম্ভে সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির কামনায় ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতীরে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ। ভোরের শান্ত প্রকৃতিতে তাদের প্রার্থনার সেই দৃশ্য চারপাশের পরিবেশে এক মায়াময় আধ্যাত্মিক আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

সময়ের পরিক্রমায় ফুল বিজু এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালিসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি আজ পরিণত হয়েছে এক সর্বজনীন মিলনমেলায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকদের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি পাহাড়িদের এই প্রাণের আয়োজনকে করে তুলেছে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও বর্ণিল।

নদীতে ফুল ভাসানোর আচার শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় আনন্দের মূল উচ্ছ্বাস। নদীতে পুণ্যস্নান, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ, ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে প্রতিটি পরিবার। গ্রামীণ নানা খেলাধুলা আর লোকজ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি পল্লীগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

ফুল বিজু মূলত টানা তিন দিনের এই বিশাল উৎসবের একটি সূচনা মাত্র। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে এটি বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু বা বিহু—নানা নামে পরিচিত হলেও, সবার অন্তর্নিহিত বার্তা কিন্তু একটাই; পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানো। উৎসবের দ্বিতীয় দিনে পালিত হয় ‘মূল বিজু’। এদিন প্রতিটি ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’সহ নানান সুস্বাদু পাহাড়ি পদ, আর দিনভর অতিথি আপ্যায়ন ও আনন্দ-আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

উৎসবের শেষ দিন ‘গজ্যাপজ্যা বিজু’ পালিত হয় এক অদ্ভুত প্রশান্তির আবহে। এদিন বৌদ্ধমন্দিরে প্রার্থনা, বয়োজ্যেষ্ঠদের বিশেষ সম্মান জানানো এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার মধ্য দিয়ে দিনটি কাটে শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। পাহাড়িদের বিশ্বাস, বছরের এই দিনটি হাসি-আনন্দে কাটাতে পারলে পুরো বছরই সবার জীবনে সুখ ও শান্তি বিরাজ করবে।

এদিকে মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব এই আয়োজনে এনে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। তাদের উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো মৈত্রী পানি বর্ষণ বা জলকেলি। এর পাশাপাশি চলে বিশেষ প্রার্থনা, পিঠা তৈরির ধুম এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-গানের আসর। একে অপরের গায়ে পবিত্র জল ছিটানোর এই অনাবিল আনন্দে যেন ধুয়ে যায় পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি, আর বুকভরা উচ্ছ্বাসে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে।

সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি এখন এক জীবন্ত ও বর্ণিল উৎসবচিত্র। ফুলের সুবাস, মানুষের বাঁধভাঙা হাসি আর নিজস্ব সংস্কৃতির রঙে রাঙানো এই মনোমগ্ধকর আয়োজন যেন নতুন দিনের আশায় ভরিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি হৃদয়।