সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

১৮৪ বছরের ঐতিহ্য: রাউজানে কাল পাহাড়ি-বাঙালির মহামুনি মেলা

আমির হামজা | প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১:০৮ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন মহামুনি বিহার প্রাঙ্গণ এখন উৎসবের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আগামীকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে এই পুণ্যভূমিতে বসতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মহামুনি মেলা। প্রায় ১৮৪ বছরের প্রাচীন এই মেলাটি স্থানীয়দের কাছে ‘জুম্ম মেলা’ নামেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই মেলা এবারও রূপ নিতে যাচ্ছে পাহাড়ি ও বাঙালি জাতিসত্তার এক অনন্য মিলনমেলায়।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবারের উৎসবে দুই লক্ষাধিক মানুষের বিপুল সমাগম ঘটবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ দলে দলে এই বিহারে সমবেত হবেন। মহামুনি দিঘির পবিত্র জলে পুণ্যস্নান শেষে বিহারে বুদ্ধ পূজা ও সমবেত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তারা পুরোনো বছরকে বিদায় জানাবেন এবং নতুন বছরকে বরণ করে নেবেন।

মেলার বর্ণিল প্রস্তুতি সম্পর্কে মহামুনি বিহার পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কেতন মুৎসুদ্দী জানান, দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের রাত্রিযাপন ও বিশ্রামের জন্য বিহার প্রাঙ্গণ এবং চাইঙ্গা ঠাকুর উদ্যানে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নজরদারি। পাশাপাশি মঞ্চায়নের মাধ্যমে আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মনোজ্ঞ পরিবেশনার আয়োজন রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রেখে মেলার দোকানগুলোতে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি রোধেও কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি থাকবে।

উৎসবের সূচি অনুযায়ী, ১৩ এপ্রিল আদিবাসীদের চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান শেষে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে আনন্দ শোভাযাত্রার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিহারে এসে বুদ্ধ পূজায় অংশ নেবেন। এরপর ১৪ ও ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় মহামুনি বটমূল খ্যাত ফনীতটী মঞ্চ ও মন্দির চত্বরে গ্রামের দুই সামাজিক সংগঠন মহামুনি সংস্কৃতি সংঘ এবং মহামুনি তরুণ সংঘের পৃথক আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে জমকালো বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সেখানে নৃত্য-গীত, নাটক, মূকাভিনয় ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই বিহার প্রাঙ্গণে কারুশিল্প, হস্তশিল্প, প্রসাধনী, মিষ্টান্ন ও মৌসুমি ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। অতীতে মাসব্যাপী চলা এই মেলা বর্তমানে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত হলেও এর ঐতিহ্য ও আবেদনে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।

বিশাল এই জনসমাগমের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। মেলায় আগত আদিবাসীসহ সকল দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেলা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাম পুলিশ কাজ করবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান অর্পিতা মুৎসুদ্দি।

এ বিষয়ে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম জানান, পুণ্যার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজেদুল ইসলাম পলাশ জানান, মেলা প্রাঙ্গণে সাদা পোশাকে টহলসহ পুলিশের সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

সর্বোপরি, রাউজানের এই মহামুনি মেলা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করার এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।