
গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদ এবং তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা। আজ রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে সাতকানিয়ার কেরানীহাটে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে দুপুরের পর থেকেই দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় নেতা-কর্মীদের হাতে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই’, ‘গণভোট মানতে হবে’—এমন নানা দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। নেতা-কর্মীরা গণভোটের পক্ষে এবং সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভ মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহজাহান চৌধুরী এমপি বলেন, আজকের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুরো মন্ত্রিসভা, এমনকি সংসদ সদস্যরাও জুলাই বিপ্লবের কারণে নির্বাচিত হয়েছেন। এক দলকে বিদায় করে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাতে জুলাই বিপ্লব হয়নি। জুলাই বিপ্লব হয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার জন্য রচিত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য। এ জন্য সংবিধান সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে বলে শাহজাহান চৌধুরী এমপি জানান।
শাহজাহান চৌধুরী এমপি আরও বলেন, যাঁরা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁদেরকে ছাত্র-জনতা মাত্র ৩৬ দিনে ১৭ বছরের ক্ষমতার মসনদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আজ যাঁরা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন, তাঁদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত বলে আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী এমপি মন্তব্য করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য অবশ্যই সংবিধান প্রয়োজন। কিন্তু সেই সংবিধান মুজিববাদের সংবিধান নয়, শেখ হাসিনার সংবিধান নয়, কিংবা বিএনপির মনগড়া সংবিধানও নয়। সংবিধান হতে হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে দলীয়করণ বন্ধ হবে, একনায়কতন্ত্র বন্ধ হবে এবং সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন হবে। এ কারণেই বিএনপি গণভোট মানে না বলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী দাবি করেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সহজে মেনে নেয়নি। অনেক রক্তের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বিএনপি সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল। আজও সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে। রাজপথের আন্দোলন সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনে না বলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী সতর্ক করেন।
সমাবেশে নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর নায়েবে আমির অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেগুলো সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেগুলো বিএনপি সরকারের খুব পছন্দ। কিন্তু যেসব অধ্যাদেশ জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনে, সেগুলো বিএনপি সরকারের অপছন্দ। এ কারণে বিএনপি বাছাই করে সেসব অধ্যাদেশ বাতিলের পথে হাঁটছে বলে নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর নায়েবে আমির অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখ করেন।
খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সেক্রেটারি মাওলানা নোমানুদ্দীন বলেন, বিএনপির রাজনীতি একদিকে সুবিধাবাদী, অন্যদিকে মুনাফেকি। বিএনপি নেতারা মুখে এক কথা বলেন, কাজে আরেকটি করেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি ও তারেক রহমান গণভোটের রায় মানছেন না। ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সেক্রেটারি মাওলানা নোমানুদ্দীন জানান।
এবি পার্টির নেতা ইঞ্জিনিয়ার যায়েদ হাসান চৌধুরী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য বৈধ হলেও, গণভোটে জয়ী হওয়ার পর সেটিকে বিএনপি অবৈধ বলছে। নির্বাচনের আগে গণভোটের বিপক্ষে কথা না বললেও, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিএনপির হওয়ায় বিএনপি জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে এবি পার্টির নেতা ইঞ্জিনিয়ার যায়েদ হাসান চৌধুরী অভিযোগ করেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সিফাত বলেন, জনগণের চাহিদা বুঝুন এবং গণরায় মেনে নিন। অন্যথায় আমরা ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হব বলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সিফাত হুঁশিয়ারি দেন।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন হেলালী বলেন, বিএনপি দেশের বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং পুলিশ বাহিনীকে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বৈরশাসন কায়েম করতে চায়। তাই ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এই বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে। এরপরও যদি বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে টালবাহানা করে, তবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন হেলালী কঠোর বার্তা দেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হকের সঞ্চালনায় সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।