সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: বাঁশখালীর পাঁচ যুবকসহ নিখোঁজ আড়াইশ, স্বজনদের কান্না

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ৬:২২ অপরাহ্ন


সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে প্রায় ২৮০ জন যাত্রীবাহী একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভয়াবহ এই ঘটনায় বাঁশখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব পুঁইছড়ি গ্রামের যে পাঁচজন যুবক এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন, তারা হলেন— নজির আহমদ সওদাগরের ছেলে মো. রুবেল, আবদুর রহমানের ছেলে মো. ওসমান গণী, জাফর আলমের ছেলে মো. বেলাল উদ্দিন, তৈয়ম দুলালের ছেলে আজিজ এবং মখছুদ আলমের ছেলে জামাল উদ্দিন ওরফে মানিক।

নিখোঁজ জামাল উদ্দিন ওরফে মানিকের বাবা মকছুদ আলম জানান, দালাল চক্র কাজের সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে তার ছেলেকে নিয়ে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন ট্রলারটি সাগরে ডুবে গেছে, কিন্তু ছেলের কোনো সন্ধান এখনো তিনি পাননি। মকছুদ আলম আরও অভিযোগ করেন, দালালরা প্রথমে বিদেশে কাজের লোভ দেখায় এবং পরে থাইল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। এরপর মালয়েশিয়ায় পাঠানোর নাম করে আবারও তারা টাকা হাতিয়ে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সাগরপথে পাঠানো হয়।

পূর্ব পুঁইছড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. আরিফুল ইসলাম জানান, তার এলাকার অন্তত পাঁচজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ওই ইউনিয়নের আরও ১০ থেকে ১৫ জন ওই ট্রলারে থাকতে পারেন বলে তিনি ধারণা করছেন, যার কারণে পুরো এলাকাজুড়ে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

ট্রলার ডুবির পর ভাসমান অবস্থায় গত ১১ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি জাহাজ ৯ জনকে উদ্ধার করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ গত ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে বিপদগ্রস্ত যাত্রীদের দেখতে পায়। পরে ভাসমান অবস্থায় ওই ৯ জনকে উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ ‘মনসুর আলী’-তে স্থানান্তর করা হয়।

উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। বাংলাদেশিরা হলেন— কক্সবাজার সদর সমিতি পাড়ার মো. হামিদ, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মো. মহিউদ্দিন হৃদয়, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মো. তোফাইল, হোয়াইক্যংয়ের মো. সোহান উদ্দিন, নুনিয়ারছড়ার মো. আকবর এবং টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মো. সৈয়দ আলম। অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা হলেন— উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের মো. রফিকুল ইসলাম, রাহেলা বেগম এবং মো. ইমরান।

উদ্ধার হওয়া উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গত ৪ এপ্রিল তাকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাজারছড়া এলাকার একটি পাহাড়ে আরও ৫০ থেকে ৬০ জনের সাথে তাকে বন্দী করে রাখা হয়। গভীর রাতে একটি কার্গো বোটে তোলার পর তিনি দেখেন, সেখানে ক্যাম্পের পরিচিত কয়েকজনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছেন। টানা আট দিন সাগরে চলার পর ৯ এপ্রিল তারা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছান। এসময় মাঝি ও তার লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের বিরোধ সৃষ্টি হলে সবাইকে জিম্মি করে বোটের বরফঘরে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পরই বোটটি ডুবে যায়। তখন মো. রফিকুল ইসলাম ও আরও কয়েকজন পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভাসতে থাকেন। ট্রলারটিতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরেক উদ্ধারপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা মো. ইমরান জানান, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে যাত্রা করেছিলেন। সাগরে ভাসমান থাকার দুঃসহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে মো. ইমরান বলেন, এত মানুষ মারা গেছে তা তিনি ভাবতেই পারছেন না এবং বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় আদালতের মাধ্যমে বাড়িতে ফিরেছেন।

টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার ফেরত আসা মো. সোহান উদ্দিনের বাবা শামসুর আলম জানান, এলাকার এক বন্ধু এনায়েত খেলার কথা বলে তার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরে দালালের কাছে বিক্রি করে তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। শনিবার রাতে থানা থেকে খবর পেয়ে তিনি ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। শামসুর আলম অভিযোগ করেন, সাগর থেকে উদ্ধার করে থানায় আনার পর রোহিঙ্গাদের ছেড়ে দিলেও স্থানীয়দের দালাল হিসেবে আসামি করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে থানায় আনা হয়। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভিকটিমদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

শাহপরীরদ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সনজীব জানান, এই ঘটনায় কোস্ট গার্ডের পেটি অফিসার শামসুল আলম বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছেন। মামলার তথ্যমতে, ‘তানজিনা সুলতানা’ নামের বোটে করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে বৈরী আবহাওয়ায় এই মর্মান্তিক ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবপাচার চক্র দমনে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের দুর্ঘটনা থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।