সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দক্ষিণ চট্টগ্রামে যত্রতত্র বাজছে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন: নির্বিকার প্রশাসন, অতিষ্ঠ জনজীবন

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ৬:৩৬ অপরাহ্ন


দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী যানবাহনে অবাধে বাজানো হচ্ছে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন। উচ্চমাত্রার এই শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সড়ক পরিবহন আইনে জরিমানার বিধান থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শব্দদূষণ এবং তৈরি হচ্ছে মারাত্মক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি।

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করলে প্রথমবার ১৫ হাজার এবং দ্বিতীয়বার ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর ও ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সড়কে এই হর্ন বন্ধে দৃশ্যমান কোনো অভিযান নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারের জরিমানা অনেক বেশি হওয়ায় মামলা দিলে গাড়ির মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এছাড়া মামলা দেওয়ার কারণে পরিবহন সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়।

দায়িত্বরত ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা দাবি করেন, হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো যানবাহনের বিরুদ্ধে তারা নিয়মিত মামলা দিচ্ছেন। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা মূলত যানবাহনের কাগজপত্র, ট্যাক্স টোকেন, রোড পারমিট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ত্রুটির জন্যই চালকদের জরিমানা করেন। একই যানবাহনে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন থাকলেও সেটির বিরুদ্ধে দোহাজারী হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাদের কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ, মইজ্জ্যার টেক, পটিয়ার শান্তিরহাট, চন্দনাইশের খাঁনহাট, দোহাজারী, কেরানীহাট এবং লোহাগাড়ার আমিরাবাদ এলাকা ঘুরে এমন নৈরাজ্যের চিত্র দেখা যায়। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস থামিয়ে চালকরা হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে যাত্রী তোলেন। যানজটের মধ্যেও ক্রমাগত হর্ন বাজানো হয়। হর্নের বিকট শব্দে রাস্তার পাশে হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো পরিবহন শ্রমিকদের হাতে নাজেহাল হতে হয় সাধারণ মানুষকে।

১২ এপ্রিল কেরানীহাট বান্দরবান রাস্তার মাথা মোড়ে বিকট শব্দ থেকে বাঁচতে ব্যবসায়ী মো. আলী এবং শিক্ষার্থী রায়হান নামের দুজনকে দুই হাতে কান চেপে ধরতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী রায়হান জানান, যানবাহনের চালকরা সড়কে অযথাই নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন বাজাচ্ছেন, কিন্তু এমন বিকট শব্দ করা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (আশা) তথ্যমতে, মানুষের জন্য শ্রবণযোগ্য শব্দের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবেল। অথচ হাইড্রোলিক হর্ন ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ ছড়ায়, যা টানা ৯ সেকেন্ড শুনলেই মারাত্মক ক্ষতিকর।

কেরানীহাটের ব্যবসায়ী মো. বোরহান জানান, বাসগুলো স্টেশনে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড শব্দে হর্ন বাজিয়ে যাত্রী তুললেও প্রশাসনের নীরবতার কারণে সড়কে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বেড়েই চলছে। সাতকানিয়ার জনার কেঁওচিয়া এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষক শাহ আলম জানান, তিনি কেরানীহাট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে থাকেন এবং প্রতিদিন ভোরে বাসের হাইড্রোলিক হর্নের কারণে ঘুমাতে পারেন না।

শিক্ষক শাহ আলম আরও জানান, চালকরা এক মিনিটে ২০ থেকে ৩০ বার বিকট শব্দে হর্ন বাজান। নিষেধ করলেও তারা পাত্তাই দেন না। আশপাশে হাসপাতাল থাকায় রোগীরা এই শব্দদূষণে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ট্রাফিক পুলিশকে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান শিক্ষক শাহ আলম।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের লোহাগাড়া শাখার সদস্য মো. সোহাগ মিয়া বলেন, শব্দদূষণ এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন কঠোর না হলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান এবং দ্রুত অভিযান জোরদারের দাবি জানান।

সাতকানিয়ায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (টিআই) নুরে আলম সিদ্দিকী সড়কে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। তবে গত এক বছরে কতটি মামলা দিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য টিআই নুরে আলম সিদ্দিকী দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, লোহাগাড়ায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (টিআই) হাসানুজ্জামান জানান, বড় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও অধিকাংশ বাসে হাইড্রোলিক হর্ন পাওয়া যাচ্ছে এবং ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে। দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান, মহাসড়কে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং আগামীতে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।