সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সাগরের বুকে হারানো স্বপ্ন: পুঁইছড়ির পাঁচ ঘর, পাঁচটি অপেক্ষা

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ৮:৩০ অপরাহ্ন


মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন খতিজা বেগম। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে তার বুকফাটা কান্নায়। পাশে দাঁড়ানো এক নারী বারবার টেনে তুলতে চাইছেন তাকে, কিন্তু পারছেন না। সন্তান হারানোর শোক কি আর সামলানো যায় এভাবে?

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি গ্রামে এখন শুধু কান্না আর অপেক্ষা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল স্বপ্নের যাত্রা

গত ১ এপ্রিলের সকালটা ছিল অনেকটা সাধারণ দিনের মতোই। পেশায় জেলে আজিজুর রহমান প্রতিদিনের মতো কাজের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। অটোরিকশাচালক বেলাল উদ্দিনও হয়তো ভাবেননি সেদিন সকালে বাড়ির দরজা পেরোলে আর ফেরা হবে না।

কিন্তু সেদিনই ছিল তাদের শেষ বিদায়।

দালাল জসীম উদ্দিন একে একে ঘুরেছেন এই গ্রামে। মালয়েশিয়ায় “ভালো কাজ”, “ভালো জীবন” — রঙিন সব কথার ফাঁদ পেতেছেন সহজ-সরল মানুষদের সামনে। যে গ্রামে স্বপ্ন দেখার সুযোগ কম, সেখানে এমন প্রলোভন ফিরিয়ে দেওয়া সহজ নয়।

এভাবেই পুঁইছড়ির পাঁচটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন পাঁচ যুবক — রুবেল, ওসমান গণী, বেলাল উদ্দিন, আজিজুর রহমান আর জামাল উদ্দিন। এদের মধ্যে ওসমান গণী মাস্টার নজির আহমদ কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বয়স কতটুকু আর? জীবনটাই তো সবে শুরু হচ্ছিল।

টেকনাফ থেকে আন্দামান — এক ভয়াবহ যাত্রা

৪ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের ইনানী ও টেকনাফ থেকে ছোট ছোট নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় একটি ট্রলারে তোলা হলো প্রায় ২৮০ জন মানুষকে। নারী, শিশু, তরুণ — সবাই একই স্বপ্নে বিভোর।

ট্রলার ছুটল মালয়েশিয়ার দিকে।

কিন্তু আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছাতেই বাধল বিপদ। বৈরী আবহাওয়ায় ডুবে গেল সেই ট্রলার। যারা বাঁচলেন, তারা পানির বোতল আর তেলের ট্যাংকি আঁকড়ে ধরে দুই দিন ভাসলেন উত্তাল সমুদ্রে।

৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ আন্দামানের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান নয়জনকে উদ্ধার করে। পরে তাদের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’তে স্থানান্তর করা হয়।

মাত্র নয়জন।

বাকি আড়াইশোর বেশি মানুষের খবর আজও নেই।

শেষ ফোনটা এখনও কানে বাজে

আজিজুর রহমানের বড় ভাই আনিস এখনও ভুলতে পারছেন না সেই ফোনটার কথা।

টেকনাফ থেকে শেষবার ফোন করেছিলেন আজিজুর। কণ্ঠে আতঙ্ক। বলেছিলেন, জসীম তাকে এখানে এনে আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছে। জোর করে বোটে তুলে দেওয়া হচ্ছে তাকে।

আনিস তাকে নিষেধ করেছিলেন এই পথে যেতে। কিন্তু দালালরা আগেই পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। সেই ফোনের পর আর কোনো খবর নেই আজিজুরের।

তিন ঘরে তিন নারীর কান্না

তাসমিনা আক্তার দাঁড়িয়ে আছেন ছেলে আর মেয়েকে পাশে নিয়ে। স্বামী বেলাল উদ্দিন শুধু অটোরিকশা চালিয়েই সংসার টানতেন। সেই মানুষটি নেই উনিশ দিন ধরে। এই দুই অবুঝ সন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন তিনি, কার কাছে যাবেন?

তছলিমা বেগম জানালেন, তার স্বামীর কাছ থেকে প্রথমে নেওয়া হয়েছিল দশ হাজার টাকা। মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল আরও তিন লাখ আশি হাজার। সেই টাকার স্বপ্নও গেছে, স্বামীও নেই। তিন সন্তান নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

আর খতিজা বেগম— মাটিতে লুটিয়ে পড়া সেই মা — তার ছেলে জামাল উদ্দিনের বাবা মখছুদ আলম বললেন প্রতারণার গল্পটা। প্রথমে কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠানো, তারপর থাইল্যান্ডে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়, তারপর মালয়েশিয়ার নামে আরও টাকা। এই চক্রের শেষ কোথায়?

দালালের ফাঁদ, পুরনো খেলা

গ্রামবাসীর অভিযোগ, এই জসীম উদ্দিন আর আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে একই কাজ করে আসছে। অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার কথা বলে এক সময় এলাকার মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। তবু তাদের কিছু হয়নি। হয়তো সেই দায়মুক্তিই তাদের আরও সাহসী করেছে।

থানায় জিডি হয়েছে। মামলা হয়নি এখনও।

পুঁইছড়ির অপেক্ষা শেষ হয় না

রোববারের বিকালে ফজল্লা কাটা এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন শতাধিক গ্রামবাসী। মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে তারা দাবি করেছেন হারানো স্বজনদের খোঁজের, দালালদের বিচারের।

কিন্তু সাগর তার রহস্য সহজে ছাড়ে না।

পুঁইছড়ি গ্রামের পাঁচটি বাড়িতে এখন প্রতিটি সন্ধ্যা আসে ভারী পায়ে। প্রতিটি রাত কাটে না ঘুমে। প্রতিটি ভোরে জেগে ওঠেন স্বজনরা এই আশায় — আজ হয়তো কোনো খবর আসবে।

উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন পাঁচ তরুণ। স্বপ্নটা এখন ডুবে আছে আন্দামানের গভীর জলে। আর তীরে বসে অপেক্ষা করছেন তাদের মায়েরা, স্ত্রীরা, ভাইয়েরা।

প্রতীক্ষার এই প্রহর যেন আর শেষ হতে চায় না।