
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরে একটি ইরানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি জানান, ‘তৌসকা’ নামের জাহাজটিকে থামার নির্দেশ দেওয়া হলেও সেটি তা অমান্য করে। এরপরই জাহাজটিকে জব্দ করা হয়। অন্যদিকে, ইরান এই ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছে যে, তারা শিগগিরই এই ‘সশস্ত্র জলদস্যুতার’ কড়া জবাব দেবে।
হোয়াইট হাউজ এই ঘোষণার আগে নিশ্চিত করেছিল যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তানে আয়োজিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে তেহরান এখনো এই আলোচনায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, প্রায় ৯০০ ফুট দীর্ঘ ‘তৌসকা’ নামের ওই ইরানি কার্গো জাহাজটি মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল, যা তাদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি। জাহাজটিকে থামার জন্য সতর্ক করার পরও তা অমান্য করায় মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইঞ্জিনরুমে গুলি চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেয়। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ‘তৌসকা’ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে এবং এটি অতীতেও অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে জাহাজটি সম্পূর্ণ মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এর ভেতরের মালামাল পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
পরবর্তীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় একটি নৌযান কার্গো জাহাজটিকে আটকাচ্ছে এবং জাহাজটির দিকে বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়ার এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ওমান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে। তারা জাহাজটির নেভিগেশন ব্যবস্থা অচল করে মেরিন সেনা মোতায়েন করে জাহাজে উঠেছে। বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনীর এই ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’র জবাব দেবে।
এদিকে ট্রাম্প গত শুক্রবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ চালু থাকবে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা হয়। পাঁচ সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক হামলা চলার পর দুই সপ্তাহের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যার মেয়াদ আগামী বুধবার শেষ হচ্ছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রথম দফার আলোচনা কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছিল। এরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
রোববারের আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিনিধিরা সোমবার পাকিস্তানে পৌঁছাবেন, যেখানে দেশটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রতিনিধিদলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ছাড়াও ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জারেদ কুশনার থাকবেন, যারা আগের আলোচনাতেও উপস্থিত ছিলেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা দাবি করেছে যে, দ্বিতীয় দফায় আলোচনার খবরটি আদৌ সত্য নয়।
হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এটিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে ইরান নিজেদের বাছাই করা দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে কার্যত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তেহরান কিছু নির্দিষ্ট জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ আদায় করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ইরান সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ করে দিয়েছেন, যদিও এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ট্রাম্প এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরান তাদের পছন্দের লোকদের কাছে তেল বিক্রি করে টাকা আয় করবে আর অপছন্দের লোকদের কাছে বিক্রি করতে দেবে না, সেটি হতে দেওয়া হবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয় সবাই পার হবে, নয়তো কেউই যেতে পারবে না বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে জানিয়েছেন, এই অবরোধ চলমান পরিস্থিতি সমাধানের একটি অন্যতম পথ। বিশ্লেষকরাও মনে করেন, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান মূলত আমেরিকার শর্ত অনুযায়ী একটি চুক্তিতে আসতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।