
চট্টগ্রামের গণি বেকারি এলাকার কিউসি পেট্রোল পাম্পের সামনের দৃশ্য। আজ সোমবার সকাল। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রাইভেটকার চালক রহমত আলী এবং মোটরসাইকেল নিয়ে আসা চাকরিজীবী সালেহ আহমেদ। রহমত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ভাই, অকটেনের দাম একলাফে ২০ টাকা দাম বাড়াল সরকার, কিন্তু তেল তো পাচ্ছি না। গতকালও তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আজকেও একই অবস্থা। পেটের দায় তো আর এই অজুহাত বোঝে না!” চট্টগ্রামের এই চিত্র যেন আজ সারা দেশেরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে পকেট কাটা যাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষায় সময় ও শক্তির চরম অপচয় ঘটছে। সাতকানিয়ার কৃষক মো. মেহেদীর অবস্থাও অভিন্ন; দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া সামান্য পরিমাণ ডিজেল দিয়েই তাকে ধুঁকে ধুঁকে সেচযন্ত্র চালাতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকট আর ভোগান্তির মাঝেই লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন জাগিয়েছে—দাম বাড়ানোর পর কি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে? স্বস্তির খবর হলো, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সরবরাহ বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানিগুলোকে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ করে বাড়ানোর সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গত রাতেই তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আজ সোমবার থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলো বর্ধিত পরিমাণে তেল পেতে শুরু করবে।
সংকটের শেকড় খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অস্থিরতা সবার আগে সামনে আসে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আক্রমণের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। মার্চ মাসে সরকার তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, বিশ্বের সব দেশে তেল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। এ খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শনিবার দিবাগত রাতে আকস্মিকভাবে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণেই সরকার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। যেহেতু এটি বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয়, তাই পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় রাখতে এই দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী আরও জানান, বাড়তি দামে আমদানি করে যে মজুত তৈরি করা হয়েছে, সেই বাড়তি খরচের কিছুটা সমন্বয় করতেই বর্তমান এই মূল্যবৃদ্ধি। উল্লেখ্য, এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে সে সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য লাগামহীন হয়ে পড়েছিল।
জ্বালানি তেল খাত থেকে সরকার প্রতিবছর শুল্ক ও কর বাবদ ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব আদায় করে। পাশাপাশি বিপিসি ও এর অধীনস্থ কোম্পানিগুলোও নিয়মিতভাবে বড় অঙ্কের মুনাফা করে আসছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মার্চ মাসে বিপিসিকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এই ঘাটতি কমাতেই নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার ফলে বিপিসির মাসিক আয় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কেবল ডিজেল থেকেই আসবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
মজুতের হিসাব কষলে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এপ্রিলে প্রায় চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে বর্তমান মজুত এবং পাইপলাইনে থাকা সরবরাহের পরিমাণ বেশ সন্তোষজনক। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন করে জাহাজ এসে পৌঁছানোয় মজুত সক্ষমতার চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন অকটেন ও পেট্রল উৎপাদিত হচ্ছে, যা বর্তমান চাহিদা মেটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানিয়েছেন, দাম বাড়ানো সরকারের জন্য একটি নিরুপায় উদ্যোগ ছিল। দেড় মাস ধরে বাড়তি খরচ মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত দাম বাড়াতে হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেবে। মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক হবে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও, এটি সরকারের বাড়তি খরচের চাপ কিছুটা প্রশমন করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। এখন সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া—বাড়তি দাম দিয়ে হলেও অন্তত নিরবচ্ছিন্নভাবে তেলটুকু যেন তারা পাম্পে গিয়ে পান।