সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পুলিশ ক্যাম্পের দরজায় বিচার খোঁজেন যারা

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ | প্রকাশিতঃ ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫:৩০ অপরাহ্ন


রাত তখন প্রায় আটটা। মাতারবাড়ী পুলিশ ক্যাম্পের সামনে জুতার স্তূপ। দরজার ভেতরে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছেন একদল মানুষ— কেউ লুঙ্গি পরা কৃষক, কেউ নেকাব পরা গৃহিণী, কেউবা মাথায় টুপি দেওয়া বৃদ্ধ। বাইরে আরও কয়েকজন অপেক্ষায়। রাতের নীরবতায় ক্যাম্পের বাল্বের হলুদ আলো যেন একটা আলাদা জগৎ তৈরি করেছে— যে জগতে মানুষ আসে বিচার চাইতে। আদালতে নয়, ইউনিয়ন পরিষদে নয়— পুলিশ ক্যাম্পে।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নে এটাই এখন বাস্তবতা।

যে কারণে মানুষ আসে

জমির বিরোধ নিয়ে আসেন পড়শি দুই ভাই। পাওনা টাকার হিসাব মেটাতে আসেন দোকানদার। সংসারের ঝগড়া নিয়ে আসেন স্বামী-স্ত্রী। ছোট মারামারির পর আসেন দুই পক্ষের লোকজন। গন্তব্য একটাই— মাতারবাড়ী পুলিশ ক্যাম্প।

কেন আসেন? উত্তরটা তাঁরা নিজেরাই দেন সরলভাবে— “ইউনিয়ন পরিষদে গিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি, কাজ হয় না। এখানে আসলে তাড়াতাড়ি একটা কিছু হয়।”

এই ‘তাড়াতাড়ি’র টানেই ভিড় বাড়ছে। দ্রুত নিষ্পত্তি, কাছে আসার সুবিধা, আর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর সুযোগ — এই তিনটি কারণ মিলে পুলিশ ক্যাম্পকে পরিণত করেছে এক অঘোষিত বিচারালয়ে।

আস্থার সংকট যেখানে শুরু

একসময় ইউনিয়ন পরিষদের সালিশ ছিল গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। চেয়ারম্যানের ডাক পেলে দুই পক্ষই আসত, মিটমাট হতো। সেই আস্থা কোথায় গেল?

স্থানীয়রা বলছেন, অভিযোগ জমা পড়ে কিন্তু নড়াচড়া নেই। তারিখের পর তারিখ যায়, সমাধান আসে না। সেই সঙ্গে আছে পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা। মানুষ তাই বিকল্প খুঁজছে। আর সেই বিকল্পের নাম হয়ে উঠেছে পুলিশ ক্যাম্প।

কিন্তু এই বিকল্পও যে নিরাপদ, তা নয়।

ভেতরের অন্ধকার

ক্যাম্পকেন্দ্রিক এই ‘বিচার ব্যবস্থা’কে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরেকটি চক্র। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী, দলীয় পরিচয়ের আড়ালে, ‘বিচার করিয়ে দেওয়ার’ দালালি করছে বলে অভিযোগ একাধিক ভুক্তভোগীর। উভয় পক্ষের কাছ থেকেই নেওয়া হচ্ছে অর্থ। কয়েক হাজার টাকার লেনদেন হচ্ছে মুখে মুখে— কোনো কাগজ নেই, কোনো রেকর্ড নেই।

ফলে মীমাংসার বদলে কখনো কখনো জন্ম নিচ্ছে নতুন জটিলতা। যে মানুষটি সমাধান নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, কিছুদিন পরেই দেখছেন সেই সমাধান টেকেনি। একই বিরোধ, নতুন রূপে।

আইন কী বলে

বিষয়টি শুধু কার্যকারিতার প্রশ্ন নয়, এটি আইনের প্রশ্নও।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট রিদোয়ানুল হক বিষয়টি স্পষ্ট করেন— পুলিশের এখতিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর অপরাধ প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ। বিচারিক ক্ষমতা একমাত্র আদালতের। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ আর লিখিত রায় ছাড়া কোনো নিষ্পত্তি আইনগত বৈধতা পায় না।

তাঁর সতর্কবাণী— স্বেচ্ছায় ও স্বচ্ছভাবে হলে আপস-মীমাংসা ভিন্ন কথা, কিন্তু সেখানে প্রভাব খাটানো বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ যুক্ত হলে তা সরাসরি আইনবিরোধী।

যা বললেন পুলিশ কর্মকর্তারা

মাতারবাড়ী ক্যাম্পের উপপরিদর্শক মোজাহের দাবি করেন, পুলিশ আদালতের ভূমিকা পালন করে না। তাঁর ভাষ্য— অভিযোগ এলে উভয় পক্ষকে ডেকে আইনের আলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়, পারস্পরিক সমঝোতার পথ দেখানো হয়। অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, প্রমাণসহ অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে মহেশখালী-কুতুবদিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মানবেন্দ্র সরকার এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসানের ফোনও বারবার অধরা থেকেছে।

সমাধান কোথায়?

ছবির দুটি দৃশ্য আসলে একটি গল্পই বলে— রাতের আঁধারে ক্যাম্পের বাইরে অপেক্ষারত মানুষ, আর দিনের আলোয় দরজার সামনে জুতার স্তূপ। দুটোতেই মানুষের আকুলতা একই— একটু ন্যায়বিচার, একটু সমাধান।

সচেতন মহল বলছেন, এই আকুলতাকে সম্মান জানাতে হলে আগে ইউনিয়ন পরিষদের বিচার ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে— স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক। না হলে মানুষ বিকল্প খুঁজবেই। আর সেই বিকল্পের ফাঁকে ঢুকে পড়বে আরও অন্ধকার।

পুলিশ ক্যাম্পের সামনে জুতার স্তূপ তখনও জমতে থাকবে।