
প্রতি বছর ভরা মৌসুমে সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে হতাশায় পৈতৃক পেশা বদলে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জেলেরা। দেশের পাঁচটি প্রজনন ক্ষেত্রের একটি মিরসরাইয়ের সাহেরখালী পয়েন্ট। কিন্তু এই পয়েন্ট ঘিরে জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠায় মাছ তার বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন করেছে। মূলত এ কারণেই আগের মতো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস ও পরিবেশদূষণকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিরসরাই উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলেপাড়ায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২ হাজার ৫৫৭ জন। এসব জেলের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৫ হাজার পরিবার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাত্র ৫ বছরেই মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণের চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এই ৫ বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ২২৭ মেট্রিক টন। সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদন বাড়াতে বছরে একাধিকবার মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও উৎপাদন না বাড়ায় জেলেরা দিশেহারা। জেলেদের ধারণা, মিরসরাইয়ের চরে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণেই ইলিশ আহরণ এভাবে কমেছে।
গত পাঁচ বছরে এই অঞ্চলে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। মিরসরাই উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে যেখানে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ২৫২ দশমিক ৩ মেট্রিক টন, ঠিক তার পরের বছর ২০২২ সালে তা বড় ধাক্কা খেয়ে নেমে আসে ১৪৭ দশমিক ৪ মেট্রিক টনে। এরপর ২০২৩ সালে ইলিশ আহরণ আরও কমে দাঁড়ায় ১১৬ মেট্রিক টনে। এই পতনের ধারা অব্যাহত থেকে ২০২৪ সালে ইলিশের উৎপাদন একেবারে তলানিতে নেমে যায়, ওই বছর মাত্র ৩৬ দশমিক ৪৯ মেট্রিক টন ইলিশ পাওয়া যায়। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালেও এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং ইলিশ আহরণ আরও কমে মাত্র ৩৩ মেট্রিক টনে এসে ঠেকেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, মূলত বেশ কয়েকটি কারণে এই অঞ্চলে ইলিশ কমে যাচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা মিঠাপানির প্রবাহ ও গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, সাগরে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ব্যাঘাত এবং পূর্ববর্তী বছরের অতিরিক্ত আহরণকেও কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বর্জ্য ও জমি ভরাট কাজে ব্যবহৃত বড় বড় ড্রেজারের কারণে সৃষ্ট দূষণ এবং ঘাটগুলোর পরিবর্তনের ফলে ইলিশের পরিমাণ কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডোমখালী জলদাশ পাড়ার জেলে রতন জলদাশ জানান, তাঁর ৬ সদস্যের সংসার। প্রতি বছর ইলিশ মৌসুমে দাদনে জাল ক্রয় করেন এবং মাছ বিক্রি করে সেই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে ইলিশ না পাওয়ায় দাদনের টাকা শোধ করতে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এছাড়া বছরে দুই বার মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে তাঁদের নিদারুণ কষ্টে দিন কাটে।
উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার জেলে জদু জলদাশ বলেন, ইলিশ এখন সোনার হরিণ। সাগর ও নদী দূষণ বেড়ে গেছে। এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ভরাট কাজে বড় বড় ড্রেজার ব্যবহারের কারণেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।
একই এলাকার অজয় জলদাশ হতাশা প্রকাশ করে জানান, সাগরে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় তিনি এখন আর সাগরে যান না। বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে বর্তমানে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েনি, যা মৎস্য বিভাগের জন্যও চিন্তার বিষয়। তিনি আরও জানান, আগে যেভাবে উপকূলে ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেভাবে পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ হলো ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিঘ্নিত হওয়া। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলাকেও ইলিশ আহরণ কমার পেছনে দায়ী করেন তিনি।