সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সূর্যের আলোয় সোনার ফসল

যেখানে লোডশেডিং ছিল কৃষকের অভিশাপ, সেখানে এখন সোলার প্যানেলের নীরব ঝলকানি হয়ে উঠেছে আশার আলো। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বদলে যাচ্ছে কৃষির চেহারা।
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ২:৫৪ অপরাহ্ন

মাঠের মাঝখানে নীল প্যানেলগুলো রোদের মধ্যে চকচক করছে। পাশেই সবুজ ধানক্ষেত—দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রযুক্তি আর প্রকৃতি কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের এই দৃশ্য এখন আর কল্পনা নয়—এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে স্থাপিত সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প এখানকার কৃষকদের দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্ন ঘুচিয়ে দিয়েছে।

দুঃখের দিনগুলোর কথা

ফসলের মৌসুম এলেই আগে আতঙ্ক শুরু হতো আনোয়ারার কৃষকদের মনে। একদিকে জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম, অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং—দুই সমস্যার চাপে চাষাবাদ হয়ে পড়েছিল রীতিমতো কঠিন। প্রতি কানি জমিতে সেচ দিতে ডিজেল পাম্পে খরচ হতো ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। বিদ্যুৎচালিত পাম্পেও গুনতে হতো ২২০০ টাকার মতো। ছোট কৃষকের জন্য এই বোঝা বহন করা ছিল প্রায় অসম্ভব।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরেকটি মাথাব্যথা—মোটর নষ্ট হওয়ার ভয়। কারেন্ট গেলে মোটর পুড়ে যায়, ডিজেল না পেলে পাম্প চলে না। মাঝে মাঝে ফসলের মাঠ পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। প্রান্তিক কৃষকরা চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথা পর্যন্ত ভাবছিলেন। সেই ঘোর অন্ধকারেই আলো জ্বালিয়েছে বিএডিসির উদ্যোগে স্থাপিত সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প।

সূর্য যখন সেচ দেয়

হাইলধর ইউনিয়নের মাঠে এখন প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা পানি উঠতে থাকে সোলার পাম্প থেকে। কোনো বিদ্যুৎ লাইন নেই, কোনো জ্বালানির ঝামেলা নেই—শুধু আছে সূর্যের আলো আর প্যানেলের নীরব কর্মযজ্ঞ। ১.৫ কিউসেক ক্ষমতার এই Low Lift Pump বা এলএলপি স্কিমটি একাই প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করতে সক্ষম।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ও পরৈকোড়া ইউনিয়নে দুটি সোলার এলএলপি সেচ স্কিম স্থাপন করা হয়েছে। হাইলধরেরটি ইতোমধ্যে পুরোদমে চালু হয়েছে। পরৈকোড়ার স্কিমটি চালু হলে আরও ১০ হেক্টর জমি সোলার সেচের আওতায় আসবে—সব মিলিয়ে মোট ২০ হেক্টর কৃষিজমি পাবে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সেচের নিশ্চয়তা।

সোলার এলএলপি প্রযুক্তিটি মূলত ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে কৃষিজমিতে সরবরাহ করে। এর হৃদয়ে রয়েছে উচ্চক্ষমতার ফটোভোল্টাইক সোলার প্যানেলের একটি সারি, যা সরাসরি সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে পাম্পকে সচল রাখে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো জ্বালানি পোড়ে না, কোনো ধোঁয়া নেই, শব্দদূষণ নেই। ফলে ফসলের মাঠের পরিবেশ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।

খরচের হিসাব যখন বদলে গেল

সংখ্যার হিসাবে দেখলে পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো। আগে ডিজেল পাম্পে প্রতি কানি জমিতে সেচ দিতে লাগত ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। বিদ্যুৎ পাম্পে সেটা একটু কম—২২০০ টাকার মতো। কিন্তু সোলার পাম্পে সেই একই কাজ হচ্ছে মাত্র ১৬০০ টাকায়। অর্থাৎ ডিজেলের তুলনায় প্রতি কানিতে সাশ্রয় হচ্ছে ৯০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত।

একটি পরিবারের দশ-বারো কানি জমি থাকলে এক মৌসুমেই সাশ্রয় হয় দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা। এই টাকা এখন যাচ্ছে ভালো বীজে, উন্নত সারে, আর পরিবারের পুষ্টিকর খাবারে। ছোট কৃষকের জীবনে এই পার্থক্যটা অনেক বড়।

হাইলধর ইউনিয়নের স্কিমটির পরিচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, “এটি দেওয়ার কারণে তাদের অনেক স্বস্তি এসেছে। বিদ্যুৎ লাইনের প্রয়োজন হয় না এবং মোটর নষ্ট হওয়ার কোনো ভয় নেই। আগে যেখানে ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে ২৫০০ টাকা এবং বিদ্যুৎ দিয়ে ২২০০ টাকার মতো খরচ হতো, এখন সোলার পাম্পের মাধ্যমে মাত্র ১৬০০ টাকায় সেই কাজ হয়ে যাচ্ছে।”

কৃষকের কণ্ঠস্বর

হাইলধর ইউনিয়নের কৃষক সাইফুল ইসলামের চোখে-মুখে এখন আর সেই দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। বছরের পর বছর ডিজেলের পেছনে ছোটা আর বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করার দিন শেষ। সোলার পাম্প চালু হওয়ার পর থেকে তার চাষাবাদে এসেছে এক নতুন গতি।

সাইফুল ইসলাম বলেন, “আগে যেখানে প্রতি কানি জমিতে সেচ খরচ হতো ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা, সোলার পাম্পের কারণে তা বর্তমানে প্রায় ১৬০০ টাকায় নেমে এসেছে। এই টাকাটা এখন সার-বীজে লাগাতে পারছি, আর ফলনও ভালো হচ্ছে।” হাইলধর ইউনিয়নে বিএডিসির মাধ্যমে আধুনিক সোলার এলএলপি সেচ প্রকল্প স্থাপনের ফলে বর্তমানে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে স্বল্প খরচে সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রকল্প শুধু সেচ খরচ কমায় না—বরং কৃষকের মনে একটি মানসিক স্থিরতা নিয়ে আসে। যখন কৃষক জানেন যে সকাল হলেই নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি পাবেন, তখন তিনি ফসল পরিকল্পনায় অনেক বেশি সাহসী হতে পারেন। তিন ফসলি চাষের স্বপ্ন তখন আর শুধু স্বপ্নে থাকে না।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আনোয়ারায় দায়িত্বরত বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজমানুর রহমান জানান, এটি কেবল শুরু। ইতোমধ্যে দুটি সোলার সেচ স্কিম সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক পাম্প স্থাপনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলার প্রতিটি কোণে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

আনোয়ারা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শামীম আহমেদ সরকার বলেন, “বর্তমানে কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় কৃষকরা যখন চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন সোলার সেচ পাম্প প্রকল্প তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উদ্যোগটি কৃষিখাতকে সমৃদ্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।”

বিএডিসির এই উদ্যোগের ফলে কৃষকরা এখন আগের তুলনায় অনেক কম খরচে তিন ফসলি চাষাবাদ করতে পারছেন। খরচ কমে আসায় প্রান্তিক কৃষকদের মুনাফার পরিমাণ বাড়ছে এবং তারা নতুন প্রযুক্তির প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সুবিধা নিতে চাইলে

সোলার সেচ পাম্পের সুবিধা নিতে আগ্রহী কৃষকদের জন্য রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। মনে রাখতে হবে, এই প্রকল্প একক ব্যক্তির জন্য নয়—সাধারণত ২০ থেকে ২৫ জন কৃষকের একটি ব্লকের জন্য একটি স্কিম বরাদ্দ করা হয়। তাই প্রথমে প্রতিবেশী কৃষকদের নিয়ে একটি ছোট সমিতি বা দল গঠন করতে হবে। এরপর আনোয়ারা উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত বিএডিসি (সেচ) কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে। যে এলাকায় পাম্প বসানো হবে সেখানকার জমির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য সেচ এলাকার ম্যাপ বা দাগ নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে আবেদনকারী কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, জমির মালিকানার প্রমাণ বা খতিয়ানের কপি, কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত কৃষক কার্ড এবং দলগত আবেদনের ক্ষেত্রে কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের বিস্তারিত তথ্য।

শেষ কথা

আনোয়ারার মাঠে এখন যে সোলার প্যানেলগুলো রোদের মধ্যে চকচক করে, সেগুলো শুধু বিদ্যুৎ তৈরি করে না—তারা কৃষকের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। তীব্র লোডশেডিং আর জ্বালানি সংকটের দিনে সৌরশক্তির এই নীরব বিপ্লব প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি আর কৃষির মেলবন্ধন ঘটলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত প্যানেল চলবে, পাম্প চলবে, পানি বইবে। আর সেই পানির ধারায় ভেসে উঠবে আনোয়ারার কৃষকের মুখে হাসি—এবং ফসলের মাঠে সোনার আভা।