সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পাহাড়ের তৃষ্ণা: যে পানির জন্য প্রতিদিন যুদ্ধ করে হাজার পরিবার

এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ৮:০৮ অপরাহ্ন

ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়েন চন্দনা ত্রিপুরা। হাতে তামার কলসি, পায়ে চলার পথ— পাহাড়ের আঁকাবাঁকা সরু গলি বেয়ে নামতে হবে নিচে। কারণ একটাই— পানি। বিশুদ্ধ, পানযোগ্য পানি। যেটুকু পেলে আজকের দিনটা চলবে।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ি আদিবাসী পাড়াগুলোতে এটাই প্রতিদিনের বাস্তবতা। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়ায় প্রায় এক হাজার ত্রিপুরা পরিবারের বাস। কিন্তু এই হাজার পরিবারের জন্য বিশুদ্ধ পানির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই। কূয়া শুকিয়ে যায় শীতে, ছরা ডুবে যায় বর্ষায়। মাঝখানে থাকে শুধু অনিশ্চয়তা আর তৃষ্ণা।

পাহাড়ের বুকে জলের আকাল

মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তালবাড়িয়া, করেরহাট ইউনিয়নের সাইবেনীখীল, নলখো, কয়লা, কালাপানিয়া এবং খৈয়াছরা ইউনিয়নের পূর্ব মসজিদিয়া ত্রিপুরাপাড়া— এই ছয়টি পাড়া যেন পানির মানচিত্রের বাইরে পড়ে আছে।

তালবাড়িয়ার রিজার্ভ পাড়া ও চৌধুরী পাড়ায় ১৪০টি পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিল কূয়া। প্রায় পাঁচ বছর আগে উপজেলা পানি ব্যবস্থাপনা ফোরামের উদ্যোগে ১৩টি কূয়া স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ১৩টির মধ্যে মাত্র ৪টিতে পানি আছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে পাওয়া রিং টিউবয়েলটিও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

পাড়ার সর্দার উত্তম ত্রিপুরা বলেন ক্লান্ত গলায়, “শীত আসলে কূয়া শুকায়, বর্ষা আসলে কূয়া ডোবে। আমরা কখন পানি পাব?”

ছরার পানিতে জীবন, ছরার পানিতেই রোগ

খৈয়াছরা ইউনিয়নের পূর্ব মসজিদিয়া পাড়ায় ৭০টি পরিবার। তাদের সবার ভরসা পাহাড়ি ছরা। কিন্তু সেই ছরাও বিশ্বস্ত নয়— শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়, বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে ঘোলা হয়ে ওঠে।

পাড়ার বাসিন্দা ধনবীর ত্রিপুরা বলেন, “আমরা পাত্রে করে পানি তুলে রাখি। সেটাই খাই, সেটা দিয়েই রান্না করি।” এই অপরিশোধিত পানি পানের ফলে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়া এই পাড়াগুলোতে নিয়মিত ঘটনা।

পাড়ার সর্দার সুমন ত্রিপুরা জানালেন, কয়েক বছর আগে একটি টিউবয়েল পেয়েছিলেন তারা। সেটিও এখন অকেজো। মেরামতের কেউ নেই, বরাদ্দ নেই।

পানি কিনে বাঁচার লড়াই

করেরহাট ইউনিয়নের সাইবেনীখীল পাড়ায় শ-খানেক পরিবার, পাঁচশোরও বেশি মানুষ। মাত্র ৩৫ জনের কাছে টিউবয়েল আছে। বাকিরা? তারা মাসে মাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে পানি কেনেন।

ভাবুন একবার— যে পানি প্রকৃতির দান, যে পানি পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার, সেই পানির জন্য দরিদ্র আদিবাসী পরিবারকে টাকা গুনতে হচ্ছে প্রতি মাসে। উষা ত্রিপুরার কণ্ঠে হতাশা, “টাকা না থাকলে পানিও মেলে না।”

নলখো পাড়ার ১১০টি পরিবারের প্রায় ৭০০ মানুষের অবস্থা তুলনামূলক সামান্য ভালো— স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি গভীর নলকূপ স্থাপিত হওয়ায় খাওয়ার পানির কিছুটা সংস্থান আছে। কিন্তু কয়লা ও কালাপানিয়া পাড়ায় সেটুকুও নেই।

পাহাড়ে নলকূপ দেওয়া যায় না— তাহলে উপায়?

উপজেলা সহকারি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাফাত ইবনে মোরশেদ সমস্যার কথা স্বীকার করে জানান, পাহাড়ি এলাকায় ভূগর্ভস্থ স্তর অনেক গভীরে থাকায় গভীর নলকূপ বসানো সম্ভব নয়। রিং টিউবয়েলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। নতুন কিছু রিং টিউবয়েল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— কতটা ধীরে? আর কত বছর?