বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আলো তখনো জ্বলজ্বল করছে। গ্যালারিতে হাজারো দর্শকের গলায় উত্তেজনার শেষ তরঙ্গ। মিরাজের বলে ফক্সক্রফটের ব্যাট থেকে বেরিয়ে গেল একটা বড় শট, লং অনে ছুটে গেলেন সাইফ হাসান, ডাইভ দিয়ে বলটা মুঠোয় পুরলেন। সেই মুহূর্তেই শেষ হলো লড়াই। নিউজিল্যান্ড অলআউট ২১০, বাংলাদেশ জয়ী ৫৫ রানে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক ওডিআই সিরিজ ২০২৬ বাংলাদেশের।
তবে এই জয় এত সহজ ছিল না।
যখন মাটিতে পড়ে গেল স্বপ্ন
সকালে টস জিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক টম ল্যাথাম বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠান। শুরুটা হলো দুঃস্বপ্নের মতো। মাত্র ৯ রানে পড়ল ২টি উইকেট। তারপর ৩২ রানে পড়ল তৃতীয় উইকেট। কিউই বোলাররা দুর্দান্ত লাইন লেন্থে বল করে যাচ্ছিলেন, ব্যাটারদের নিঃশ্বাস ফেলার জায়গাটুকুও রাখছিলেন না।
ঠিক তখনই ক্রিজে এলেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
শান্তের শান্ত কিন্তু দৃঢ় লড়াই
চারদিকে যখন ধ্বংসের ছাপ, তখন যে মানুষটা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন তাকেই বলে ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড। শান্ত সেদিন ঠিক সেটাই করলেন। নিজের মনকে শুধু একটাই কথা বোঝালেন: বর্তমানে থাকো, পেছনের ক্ষতির হিসাব ধরো না।
লিটন কুমার দাসকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে দুজন মিলে ধাতস্থ হলেন, ডুবতে থাকা নৌকাটাকে স্থির করলেন। সেই চাপের মুহূর্তে আরেকটি উইকেট পড়লে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারত। কিন্তু দুজনে মিলে সেই ঝুঁকি সামলে নেওয়ার পরই শুরু হলো মুক্ত ব্যাটিং।
শান্তের ওয়াগন হুইল বলছিল সব গল্প। লং অন আর মিড উইকেটের মাঝামাঝি দিয়ে বেরিয়ে গেছে তাঁর ৭২ শতাংশ রান। ডাউন দ্য উইকেট, পুল শট, সব ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং এলিগ্যান্ট। বাঁহাতি ব্যাটারদের যে স্বাভাবিক কমনীয়তা থাকে, শান্ত সেদিন তার সঙ্গে যোগ করলেন অদম্য মানসিক জোর। গত ম্যাচে গরমে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, এবার সেই একই তাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে খেললেন ১১৯ বলে ১০৫ রানের ইনিংস। ৯টি চার আর ২টি ছয়। তাঁর ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওডিআই সেঞ্চুরি। সিরিজে মোট রান ১৫৫।
লিটন কুমার দাসও কম যাননি। ৭০ রানের ইনিংসে তিনি এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন, যা শান্তকে দিয়েছিল স্বাধীনভাবে খেলার অনুমতি। সেই জুটিই আসলে বাংলাদেশকে লড়াইয়ের মঞ্চে ফিরিয়ে আনল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ তুলল ২৬৫ রান।
নাহিদ রানা: ঝড়ের নাম
বোলিংয়ে যখন বাংলাদেশের পালা, তখন আসরে নামলেন সিরিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম নাহিদ রানা। গতির বন্যা আর সঠিক জায়গায় বল ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে তিনি একের পর এক ভাঙলেন কিউই ব্যাটারদের মনোবল। হেনরি নিকোলসকে শর্ট বলে আউট করার সেই মুহূর্তে তাঁর মাথায় ছিল শুধু একটাই চিন্তা: দলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করো, উইকেট নাও।
সিরিজজুড়ে নাহিদ নিলেন ৮টি উইকেট, একটি পাঁচ উইকেটের হল সহ। আর অর্থনীতির হার রাখলেন ৫ এর নিচে। এর আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও যৌথভাবে সিরিজসেরা হয়েছিলেন। এবার একা। এই গতি ধরে রাখা এবং শরীরকে ম্যানেজ করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাঁর জন্য, কারণ ধারাবাহিক গতিময় বোলিং শরীরের উপর বড় চাপ ফেলে। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সবচেয়ে ভরসার নাম।
মোস্তাফিজ: নীরব ঘাতক
রানা যদি হন দৃশ্যমান ঝড়, তাহলে মোস্তাফিজুর রহমান সেই নীরব স্রোত যা ভেতর থেকে সব ভেসে নেয়। এই ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি আরেকবার প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে বারবার ফেরত আসতে হয়। শরিফুলও নিজের ভূমিকা পালন করলেন দক্ষতার সঙ্গে। তিন পেসার মিলে যেভাবে নিউজিল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিলেন, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের শক্তি ছিল স্পিন। ধীর, নিচু, বাঁক খাওয়া উইকেটে স্পিনারদের জাদুতে ম্যাচ জেতার সেই পরিচিত ছবি। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। পেস বোলাররাই এখন মূল স্ট্রাইক ফোর্স। পৃথিবীর সব বড় দলের মতো বাংলাদেশও এখন পেসকে ভরসা করতে শিখেছে। এটা শুধু কৌশলের পরিবর্তন নয়, এটা মানসিকতার বিবর্তন।
শেষ দৃশ্যে রোমাঞ্চ
কিন্তু জয়টা কি খুব সহজে এলো? মোটেই না। নিউজিল্যান্ড যখন ১৬৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলল, তখন হয়তো অনেকে ভেবেছিলেন সব শেষ। কিন্তু ফক্সক্রফট একা মাঠে দাঁড়িয়ে রীতিমতো ঝড় তুললেন। ৭২ বলে ৭৫ রান, ছক্কার পর ছক্কা। মোট সাতটি ছয়। দশম উইকেটে যোগ হলো ৫০ রান। স্টেডিয়ামে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে।
মজার বিষয় হলো, এই পুরো সিরিজের প্রথম দুটি ওডিআইতে নিউজিল্যান্ডের ব্যাট থেকে একটিও ছয় আসেনি। এমনকি আজকের ম্যাচেও ২০ থেকে ২৫ ওভার পর্যন্ত ছয়ের দেখা ছিল না। আর তারপরই ফক্সক্রফট একা বসিয়ে দিলেন সাতটি। দর্শকরা উত্তেজিত হলেন, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা ছিল “টু লিটল, টু লেট।” একটা হারা দলের শেষ বিদ্রোহ, দৃষ্টিনন্দন কিন্তু ফলহীন।
ল্যাথাম পরে স্বীকার করলেন, উপরের দিকে যথেষ্ট জুটি না হওয়াটাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। দ্বিতীয় ম্যাচের মতো এবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করল নিউজিল্যান্ড।
অধিনায়কের শব্দে বিজয়ের গল্প
বিজয়ী দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ পুরো দলকেই কৃতিত্ব দিলেন। শান্ত-লিটনের জুটি, মুস্তাফিজের বোলিং, মিরাজ নিজের নেওয়া ক্যাচ আর তৌহিদ হৃদয়ের দুর্দান্ত একটি ক্যাচ। দলের প্রতিটি সদস্য যেন একটা একটা করে ইট সাজিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন জয়ের ইমারত। ক্যাচিং বিভাগেও প্রথম ম্যাচের তুলনায় শেষ দুটি ম্যাচে বাংলাদেশ অনেকটাই উন্নত ছিল, যা জয়ের পথকে মসৃণ করেছে।
মিরাজ জানালেন, ২৬৫ রান করার পর তাঁরা জানতেন এটা রক্ষণযোগ্য সংগ্রহ। কারণ তাঁরা চেনেন এই মাটি, এই বাতাস, এই উইকেটের মেজাজ।
ইতিহাসের পাতায় নতুন সংযোজন
প্রথম ওডিআই হেরে সিরিজ শুরু করা বাংলাদেশ মিরপুরে সমতা ফিরিয়ে আনে। তারপর চট্টগ্রামে সিদ্ধান্তের ম্যাচে জিতে সিরিজ নিজেদের করে নেয় ২-১ ব্যবধানে। এটি ঘরের মাঠে বাংলাদেশের নবম দ্বিপাক্ষিক ওডিআই সিরিজ জয়, ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১২টি সিরিজের মধ্যে। পাশাপাশি ঘরের মাঠে টানা তৃতীয় ওডিআই সিরিজ জয়।
এই জয়গুলো শুধু সংখ্যা নয়। এগুলোর একটি বড় কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। আইসিসি র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ এখন নবম স্থানে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঠিক উপরে। আরেকটু উপরে উঠতে পারলে পরবর্তী বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং পর্বে খেলতে হবে না বাংলাদেশকে, সরাসরি মূল পর্বে জায়গা পাকা হয়ে যাবে। তাই এই সিরিজগুলো প্রতিটিই এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই মেডেল, সেই ট্রফি, সেই আনন্দের হুল্লোড় উপহার দিলেন শাফিকুল হক হীরা। প্রাক্তন অধিনায়কের হাত থেকে নতুন দলের হাতে চলে গেল বিজয়ের স্মারক।
সামনের দিকে তাকিয়ে
আজকের চট্টগ্রামের সন্ধ্যা একটু বেশিই লাল-সবুজ হয়ে উঠল। কিন্তু উদযাপনের ফুরসত বেশি নেই। মাত্র কয়েক দিনের বিরতিতে ২৭ এপ্রিল থেকে একই মাঠে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি সিরিজ। বিপিএলের পর থেকে এই ফরম্যাটেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা, তাই ছন্দটা ধরা থাকার কথা। ওডিআই সিরিজের এই জয়ে কনফিডেন্সও তুঙ্গে। আর এই মঞ্চেও নতুন পেসারদের ঝলক দেখতে পাবেন দর্শকরা, এমনটাই প্রত্যাশা।
এই জয়ের উত্তাপ নিয়েই বাংলাদেশ সেখানে নামবে, সেটা নিশ্চিত।