সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদ্যুৎ নেই, গরমে পুড়ছে দেশ— কাগজে ২৮ হাজার মেগাওয়াট, বাস্তবে অন্ধকার

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ৮:৩৭ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের বাসিন্দা রহিমা বেগম সারারাত ঘুমাতে পারেননি। ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে হাতপাখা বাতাস করেছেন, কিন্তু গনগনে গরমে তাতে কোনো কাজ হয়নি। রাত দুইটা থেকে ভোর পাঁচটা— টানা তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। দিনেও একই অবস্থা। প্রতিবেশী মনির হোসেন জানালেন, তার ছোট মেয়ে জ্বরে পড়েছে। গরমে ফ্যান না চললে, শিশুর কী হবে— এই ভয়ে রাতেও তার ঘুম নেই। বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে হালিশহর, অক্সিজেন থেকে বহদ্দারহাট— সর্বত্র একই চিত্র। দোকানের ফ্রিজ বন্ধ, কারখানার উৎপাদন থমকে, হাসপাতালে জেনারেটরের জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে।

এই চিত্র শুধু চট্টগ্রামের নয়। সারা দেশ এখন বিদ্যুৎ সংকটের এক অসহনীয় চাপে কাঁদছে।

কাগজে সক্ষমতা, বাস্তবে অন্ধকার

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির হিসাব বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এই সংখ্যা এখন কেবল কাগজেই আছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য বলছে, গত শনিবার দুপুর একটায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট— আর সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ছুটির দিনেও এই অবস্থা। কর্মদিবসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এবারের গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল মাসখানেক আগেই। কিন্তু সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।

জ্বালানি নেই, কেন্দ্র চলছে না

সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানি সংকট এবং বকেয়ার পাহাড়। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত শুক্রবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১৮ মেগাওয়াট। গত বছর বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এবার তা কমে এসেছে ৯২ কোটি ঘনফুটে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও করুণ। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে খারাপ কয়লা সরবরাহ করেছিল ঠিকাদার। ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্র প্রায় দুই সপ্তাহ চলেছে মাত্র ১৭০ মেগাওয়াটে। ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার কেন্দ্রটি চলছে মাত্র ৬০০ মেগাওয়াটে— কারণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া এবং জাহাজ ভাড়া নিয়ে চলমান বিরোধ। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিট বন্ধ, ভারত থেকে আমদানিও ২০০ মেগাওয়াট কমে গেছে। একের পর এক ধাক্কা সামলাতে না পেরে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়ছে।

৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া, দুই বিভাগের ঠান্ডা লড়াই

সংকটের আসল কারণ লুকিয়ে আছে অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক দ্বন্দ্বে। পিডিবির কাছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির পাওনা ৪২ হাজার কোটি টাকা। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে এ বছর পিডিবির লোকসান দাঁড়াবে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকায়।

অর্থ বিভাগ সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, যে ভর্তুকির টাকা ইতিমধ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেখানেও বসানো হয়েছে ১৩টি শর্ত। এর মধ্যে আছে— নির্দিষ্ট ৯৪টি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কাউকে বিল দেওয়া যাবে না, নরেনকো বা বি-আর পাওয়ারকে ভর্তুকির টাকা দেওয়া যাবে না। পিডিবি চাইছে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এমন কেন্দ্রগুলোর বকেয়া আগে মেটাতে, কিন্তু অর্থ বিভাগের শর্তের বেড়াজালে সেটা হচ্ছে না।

দুই বিভাগের মধ্যে চলছে চিঠি আর পালটা চিঠির যুদ্ধ। আর সেই আমলাতান্ত্রিক লড়াইয়ের মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ— ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে করতে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এই গরমে একটা ভালো প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, কিন্তু সেটা করার দায় ছিল আগের অন্তর্বর্তী সরকারের। বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সরকার মাত্র দুই মাস আগে ক্ষমতায় এসেছে এবং সমন্বয় করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা — আপাতত বৃষ্টি ছাড়া এই পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণের কোনো পথ নেই।

চট্টগ্রামের সেই রহিমা বেগম জানেন না অর্থ বিভাগ কী, ভর্তুকির শর্ত কী। তিনি শুধু জানেন, তার শিশু গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মনির হোসেন জানেন না মাতারবাড়ীতে কয়লার সংকট কেন। তিনি শুধু জানেন, ফ্যান না চললে ঘরে থাকা যায় না।

২৮ হাজার মেগাওয়াটের সক্ষমতার দেশে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদাও পূরণ করা যাচ্ছে না। এই ব্যর্থতা প্রযুক্তির নয়, প্রকৃতির নয়— এটা সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। আর সেই ব্যর্থতার ভার বহন করছে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ, প্রচণ্ড গরমে, অন্ধকার ঘরে বসে।