
কর্দমাক্ত, হাঁটুসমান ঘোলা পানি পেরিয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে একটি প্রাইভেট কার। পাশেই ঝুঁকি নিয়ে হেলেদুলে চলছে যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। রাস্তার দুপাশের বাজার ও দোকানপাটের সামনে জমে আছে পানি আর কাদামিশ্রিত ময়লার স্তূপ। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকালের হালকা বৃষ্টিতেই চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের এমন বেহাল দশা ফুটে উঠেছে। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না রেখেই অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পুরো বাজার এলাকা এখন যেন এক ‘কৃত্রিম বন্যা’র কবলে।
আনোয়ারা উপজেলার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চাতরী চৌমুহনী-সিইউএফএল-মেরিন একাডেমি সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে এমনই চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ৫৮৪ কোটি টাকার বিশাল বাজেটের এই মেগা প্রকল্পের কাজ কচ্ছপগতিতে চলায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। স্থবির হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ন্যূনতম ব্যবস্থা না রেখেই সড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই চাতরী চৌমুহনী বাজার এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। কর্দমাক্ত এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সিইউএফএল, কেইপিজেড ও মেরিন একাডেমির কর্মজীবী মানুষসহ সাধারণ পথচারীরা। কাজের এমন ধীরগতির কারণে কাফকো সেন্টারেও যানজট লেগেই থাকছে, যার ফলে শিল্প কারখানার শ্রমিকদের প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ আগে শেষ না করায় এই নরকযন্ত্রণার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পটিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) আব্দুল্লাহ আল নোমান পারভেজ। তিনি জানান, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তাহের এন্ড ব্রাদার্স’ গতানুগতিক কাজের বদলে জ্বালানি সংকটের অজুহাত দেখিয়ে চিঠি দিয়েছে। এছাড়া সড়কের দুই পাশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট কাজের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান পারভেজ বলেন, উচ্ছেদ অভিযানে গেলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপের মুখে পড়তে হয়। এক নেতা এসে এক কথা বলেন, তো অন্য নেতা এসে বলেন জায়গাটি তার। এই বিভ্রান্তি দূর করতে আগামী ৫ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের এন্ড ব্রাদার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মুন্না জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে সরঞ্জামগুলো পূর্ণগতিতে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া স্থানীয়রা রাস্তার জায়গা দখল করে দোকান বসিয়ে রাখায় মূল কাজ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এই প্যাকেজে ড্রেন নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত আছে এবং কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে তিনি দাবি করেন। বর্ষাকালে সাময়িক এই দুর্ভোগ মেনে নেওয়ার জন্য তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান।
তবে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্রশ্ন, ৫৮৪ কোটি টাকার বিশাল বাজেটের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেন জ্বালানি সংকটের মতো ঠুনকো অজুহাতে আটকে থাকবে? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বকেই এই জনদুর্ভোগের মূল কারণ হিসেবে দুষছেন তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করে সড়ক প্রশস্তকরণ কাজ সম্পন্ন করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।