
চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়াম। হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে কাঁপছে গ্যালারি। মাঠের সবুজ ঘাসে আজ পা রেখেছিল একটি ছোট্ট ছেলে— লাল ক্যাপ মাথায়, বুকে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের লোগো, গলায় ঝুলছে ম্যাচের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার আন্তর্জাতিক ম্যাচে ‘ফিউচার স্টার’ হিসেবে মাঠে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতর কী চলছিল, তা হয়তো ভাষায় বলা কঠিন। তবে তার চোখ দুটো আজ যা বলছিল, তা স্পষ্ট— এই মাঠেই একদিন সে ফিরবে, তবে খেলোয়াড় হিসেবে।
সে হলো তানজিম শাহরিয়ার তুর্য। বয়স মাত্র বারো। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের রশিদেরঘোনা গ্রামের এই কিশোর এখন পড়ে নগরীর সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে, সপ্তম শ্রেণিতে। বই-খাতার পাশাপাশি তার আরেকটি জগৎ আছে— ব্যাট, বল আর মাঠ। ‘কোয়ালিটি স্কুল অব ক্রিকেট’ একাডেমিতে সে নিয়মিত ঘাম ঝরাচ্ছে সেই জগতেরই জন্য।
এই প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে দিন পার করে, তুর্যর মা তানজিনা সুলতানা রিমি তখন ভেবেছিলেন অন্যভাবে। ছেলেকে তিনি মাঠের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন— ভালোবাসা দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে।
“বাচ্চারা এখন মোবাইল আর ডিভাইসে ডুবে যাচ্ছে,” বলেন তিনি। “আমরা চেষ্টা করেছি তাকে মাঠমুখী করতে। ক্রিকেটের মাধ্যমে সে শুধু খেলাই শিখছে না, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধও শিখছে— এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
বাবা নাজিম উদ্দিন নিয়াজও গর্বে বুক ভরে ওঠে। “এত বড় ম্যাচে ‘ফিউচার স্টার’ হিসেবে মাঠে থাকা— এটা ওর জন্য বড় অনুপ্রেরণা। আমরা চাই, এই খুদে ক্রিকেটাররা প্রিয় তারকাদের কাছ থেকে দেখে অনুপ্রাণিত হোক, ওদের স্বপ্নের সীমানা আরও বড় হোক — আর একদিন বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামুক।”

আজ মাঠে দাঁড়িয়ে তুর্য কী দেখেছিল? দেখেছিল হাজারো দর্শকের উত্তাপ, জাতীয় দলের তারকাদের আত্মবিশ্বাসী হাঁটা, বড় মাঠের অপার বিস্তার। সেই দৃশ্য তার বুকে একটা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
“জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের এত কাছ থেকে দেখে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছি,” বলে তুর্য নিজেই। “একদিন আমিও বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চাই।”
বারো বছরের কিশোরের মুখে এই কথা শুনতে হয়তো সহজ লাগে। কিন্তু যারা তাকে চেনে, তারা জানে— এই কথার পেছনে আছে প্রতিদিনের ঘাম, কোচের বকুনি সহ্য করার ধৈর্য আর পরিবারের নিঃশর্ত ভালোবাসা।
একাডেমির কোচরাও তুর্যকে নিয়ে আশাবাদী। তাদের মতে, এই ছেলের মধ্যে সম্ভাবনা আছে— কেবল দরকার সঠিক পথে নিয়মিত পরিশ্রম। ব্যাটে যেমন দক্ষতা, বলেও তেমনি— একজন পরিপূর্ণ অলরাউন্ডারের ছায়া দেখা যাচ্ছে এই কিশোরের মধ্যে।
বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড ম্যাচের সেই সোমবারের দুপুরটা তুর্যর জীবনে স্রেফ একটি দিন নয়— এটি একটি মোড়। যেখান থেকে তার স্বপ্নের রাস্তাটা আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে। পরিবারের উষ্ণতা, কোচের দিকনির্দেশনা আর নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি— এই তিনটি সুতো বুনে সে গড়ে তুলছে তার ভবিষ্যতের নকশা।
লোহাগাড়ার সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে আসা এক কিশোরের স্বপ্ন এখন মাঠের সবুজ ঘাসে পথ খুঁজছে। তুর্যর চোখে যে আলো, তা নিভে যাওয়ার নয়— বরং একদিন সেই আলোয় আলোকিত হবে গোটা দেশ, এই বিশ্বাসটুকু বুকে নিয়েই এগিয়ে চলছে চট্টগ্রামের এই ‘ফিউচার স্টার’।