সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

জ্বালানি তেল বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, নেপথ্যে কি মজুতদারি?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১১ অপরাহ্ন


দেশের সব তেলের ডিপো থেকে এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের (এপ্রিল, ২০২৫) এই সময়ের তুলনায় কোনো কোনো দিন ২০ থেকে ৩০ শতাংশেরও বেশি পেট্রল ও অকটেন বিক্রি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিক্রি বাড়ায় পাম্পগুলোর সামনে এখন গাড়ির দীর্ঘ সারি নেই, কমেছে মানুষের ভোগান্তিও। কিন্তু এত কিছুর পরও শিল্পকারখানা এবং বাস ও ট্রাকে চাহিদামতো ডিজেল মিলছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে একশ্রেণির পাম্পমালিক ও ডিলার কারসাজি করে বাড়তি টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন। তবে বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগামী এক-দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বাড়তে থাকায় তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে দাম বাড়লে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে বড় মাশুল দিতে হতে পারে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের সংগ্রহ নিয়ে আপাতত তেমন কোনো সমস্যা নেই। তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কয়েক দিন আগে সারা দেশে জ্বালানি তেলের চরম সংকট দেখা দিয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে আড়াই লাখ টন ধারণক্ষমতার আটটি তেলের জাহাজ ভিড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের ওপর থেকে রেশনিং তুলে নেয়। জ্বালানি বিভাগের নির্দেশে ২০ এপ্রিল থেকে দেশের সব ডিপো থেকে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি ডিজেল ও পেট্রল এবং ২০ শতাংশ বেশি অকটেন সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী প্রতিদিন ১৩ হাজার ৪৮ টন ডিজেল, ১ হাজার ৪২২ টন অকটেন এবং ১ হাজার ৫১১ টন পেট্রল বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু গত এক সপ্তাহের সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ডিপোগুলো থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি তেল বিক্রি হচ্ছে। গত ২৫ এপ্রিল ডিজেল ১৫ হাজার ২৭৪ টন, অকটেন ১ হাজার ৭৩৩ টন এবং পেট্রল ১ হাজার ৮০৭ টন বিক্রি হয়েছে। ২৬ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ১২৬ টন, অকটেন ১ হাজার ৬৬৭ টন ও পেট্রল ১ হাজার ৭৬৬ টন; ২৭ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ৪৮৪ টন, অকটেন ১ হাজার ৬১৬ টন ও পেট্রল ১ হাজার ৭৮৩ টন এবং ২৮ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ৩৮৩ টন, অকটেন ১ হাজার ৫৫০ টন ও পেট্রল ১ হাজার ৮৪৬ টন বিক্রি হয়েছে। অথচ গত বছরের এপ্রিলে গড়ে প্রতিদিন ডিজেল ১১ হাজার ৮৬২ টন, অকটেন ১ হাজার ১৮৫ টন এবং পেট্রল ১ হাজার ৩৭৪ টন বিক্রি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছরের তুলনায় তেলের এই অস্বাভাবিক বিক্রি রহস্যজনক এবং এটি মজুতদারি ও কারসাজির ইঙ্গিত দেয়।

ডিজেলের এই রহস্যজনক সংকটের কারণে চরম উদ্বেগে আছেন ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিকেরা। গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি কারখানার মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, কারখানার মাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত লরির জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে দৈনন্দিন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই কথা জানান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো–অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ।

তিনি বলেন, ডিজেল–সংকটে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহন এখনো ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। পণ্য বোঝাই করে নদীতে অনেক জাহাজ বসে থাকলেও তেল নেই। এর পেছনের রহস্য কোথায়, তা বোঝা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে এক লাইটারেজ জাহাজের মালিকও জানান, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য কমার পাশাপাশি ডিজেল–সংকটের কারণে নিয়মিত পণ্য পরিবহন আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজধানীতে চলাচলরত ‘এলিভেটর এক্সপ্রেস’ বাসের সহকারী হাবিব জানান, পাম্পে ১০ থেকে ২০ লিটারের বেশি ডিজেল পাওয়া যায় না। তবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিলে ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল মেলে ওই সব পাম্পে। তিনি বলেন, এমনিতে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় বাসভাড়া বাড়েনি। এখন সরকারি দামে তেল কিনতেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে বাস চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রাজধানী ঢাকায় ডিজেলের তেমন সংকট না থাকলেও ঢাকার বাইরের চিত্র ভিন্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফাহাদ পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহান নূর বলেন, গত কয়েক দিন ধরে চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে বৃষ্টির কারণে সেচকাজে ও পরিবহনে ডিজেলের চাহিদা কিছুটা কমেছে। তাই পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তেল বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার হিসাব অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৪৪ হাজার ৪৮৩ টন অকটেন, ১৯ হাজার ৩ টন পেট্রল, ৩৭ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ২১ হাজার ২০০ টন জেট ফুয়েল এবং ৫ হাজার ৭৩৫ টন কেরোসিন মজুত রয়েছে।