সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত

সাইফুল আযম | প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১:৪০ অপরাহ্ন


কথায় আছে, স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। এই কথাটি যতটা পুরোনো, ঠিক ততটাই ধ্রুব সত্য। স্বাস্থ্য মানবজীবনের এক অত্যন্ত অমূল্য সম্পদ, যার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই। আমাদের নিজেদের অবহেলার কারণে কিংবা অসচেতনতার দরুন শরীরের ওপর যদি কোনো বড় ধরনের আঘাত আসে, অথবা বড় কোনো রোগ শরীরে বাসা বাঁধে, তখন লক্ষ-কোটি টাকারও আর কোনো দাম থাকে না। সম্পদের পাহাড় থাকলেও তা দিয়ে হারানো স্বাস্থ্য পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই প্রতিটি মানুষেরই উচিত নিজের শরীরের প্রতি সবসময় যথাযথ যত্ন নেওয়া। বিশেষ করে যারা কায়িক শ্রম দেন, তাদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া কালজয়ী একটি গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে আজকের এই আলোচনা শুরু করা যাক। তিনি গেয়েছিলেন, শ্রমিক যেমন সবল হাতে, গড়ছে এই দেশ দিনে রাতে। ভিজে পুড়ে যেমন চাষি, মাটির বুকে ফোটায় হাসি। এই সহজ-সরল চারটি লাইনের মধ্যে আমাদের সমাজের, আমাদের অর্থনীতির এবং আমাদের বেঁচে থাকার এক গভীর ও অকাট্য রহস্য লুকিয়ে আছে। আমরা সভ্য সমাজের মানুষেরা অনেক সময় যাদের কৃষক, শ্রমিক বা দিনমজুর বলে খুব সহজেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, তাদের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাই, বাস্তব অর্থে তারাই কিন্তু আমাদের জীবনের প্রধান খাদ্যের জোগানদাতা। তাদের ঘাম ঝরানো শ্রমের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক সভ্যতা।

একজন পুঁজিপতি বা কোটিপতি মানুষের বিলাসবহুল গাড়ি, আলিশান বাড়ি এবং অঢেল ধনসম্পদ থাকতে পারে, যা এই পৃথিবীতে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সেই আরামদায়ক জীবনের আড়ালে তিনি যদি একদিনের জন্য খোলা মাঠে, প্রখর রোদে কিংবা কনকনে শীতের তীব্রতায় কৃষকের মতো জমিতে গিয়ে ধান চাষ করতে যান, অথবা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় রিকশা চালাতে যান, তবে তা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কারণ তার শরীর ও মন এই কঠোর কায়িক শ্রমের সাথে বিন্দুমাত্র অভ্যস্ত নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দুনিয়া পরিচালনা করা আর রোদে পুড়ে ঘাম ঝরিয়ে মাটি কাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। এই দুই জীবনের বাস্তবতা কখনো এক বিন্দুতে মেলে না।

অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিক প্রতিদিন শরীরের রক্তকে বিন্দু বিন্দু ঘামে পরিণত করেন। তারা দিনে এনে দিনে খায় নীতিতে জীবন অতিবাহিত করেন। অথচ আমাদের এই তথাকথিত সভ্য সমাজ তাদের অধিকারের কথা কি একবারও গভীরভাবে চিন্তা করে? তারা সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ ভরসা করে কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়ে যান। কৃষক ছুটে যান ফসলের জমিতে, শ্রমিক যোগ দেন কলকারখানায়, আর দিনমজুররা ছড়িয়ে পড়েন রাস্তাঘাটে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা যে সামান্য অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়েই কোনোমতে অভাবের সংসার চালান। তাদের শেয়ার বাজারের ধস নিয়ে টেনশন নেই, বড় কোনো চিন্তাও নেই। তারা যা খান, তা কঠোর পরিশ্রমের কারণে খুব সহজেই হজম হয়ে যায় এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ ঘামের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। তারা দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করেন কেবল দুই মুঠো সাধারণ ভাত আর সামান্য সবজির জন্য। তাদের জীবনের একটাই চাওয়া, দিন শেষে পরিবার-পরিজন নিয়ে যেন দুবেলা পেট ভরে অন্ন গ্রহণ করতে পারেন।

আমরা যখন প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে দামি গাড়ি বা আরামদায়ক যানবাহনে কর্মস্থলে যাতায়াত করি, তখন রাস্তার পাশে তাকালেই দেখতে পাই প্রকৃত শ্রমিক কাকে বলে! তাদের শরীর ক্রমাগত ঘামে জবজবে হয়ে থাকে, চেহারায় জমে ধুলোবালির আস্তরণ, অনেক সময় তাদের চেনাই দায় হয়ে পড়ে। যারা ইটভাটায় কাজ করেন কিংবা মাটি কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন, তাদের অবস্থা দেখলে হৃদয় কেঁপে ওঠে। একেকটা মানুষের শরীর যেন পুষ্টিহীনতায় ভুগে জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। এর চেয়েও বড় আক্ষেপের বিষয় হলো, সমাজে আজও কোমলমতি শিশু এবং নারীরা পাথর ভাঙার মতো কঠিন কাজে যুক্ত। তারা মিলকারখানায় কাজ করছেন, বিল্ডিংয়ের ইট ভাঙছেন। তাদের শরীর থেকে যেন ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ছে।

সহজ কথায়, যে মানুষরা নিজেদের কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জীবনযাপন করেন, তাদেরকেই আমরা শ্রমিক বলি। অগণিত শ্রমিক শ্রেণিই হলো দেশ গঠনের মূল কারিগর। কেউ কৃষিকাজ করে খাদ্যের জোগান দিচ্ছেন, কেউ মাছ চাষ করে আমিষের চাহিদা পূরণ করছেন। কেউ তুলা চাষ করে কাপড় তৈরিতে সহযোগিতা করছেন। কামার লোহা পিটিয়ে তৈরি করছেন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। কুমোর কাদা মাটি দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করছেন জিনিসপত্র। দর্জি বুনে দিচ্ছেন আভিজাত্যের পোশাক। কাঠমিস্ত্রিরা শক্ত কাঠকে নিপুণ ছোঁয়ায় দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন দিয়ে তৈরি করছেন আসবাবপত্র। রাজমিস্ত্রিরা রড, বালি, সিমেন্ট, ইট দিয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলছেন উঁচু ভবন। আর সেইসব সুরম্য ভবনে বসে ধনী ব্যক্তিরা অত্যন্ত আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন।

মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের সৃষ্টিজগতের সেরা জীব বলে দাবি করি। অথচ যে মানুষগুলো জীবন বিপন্ন করে আমাদের সুখের জন্য কাজ করে যান, তাদের সুখ-দুঃখের কথা আমরা কি ভেবে দেখি? ধর্মে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার পরিশ্রমের পাওনা বুঝিয়ে দাও। কিন্তু সমাজে আমরা এর ভিন্ন চিত্র দেখি। পাওনা নিয়ে টালবাহানা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এক ধরনের সামাজিক অপরাধ, যা কখনোই কাম্য নয়। আমাদের এই মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে।

এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। আমরা যারা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাই, আমাদের উচিত তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া। কাজের ক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পেশাজীবী শ্রমিক, তা সে কামার, কুমোর, দর্জি, গার্মেন্টস কর্মী বা যে-ই হোন না কেন, যারা কলকারখানা ও রাস্তাঘাটে উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত, তাদের প্রতি আমাদের মানবিক হতে হবে। আমাদের উচিত তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের প্রতি নজর দেওয়া এবং দুবেলা খাবার নিশ্চিত করা। সমাজের প্রতিটি স্তরে যখন মেহনতি মানুষের এই মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে, কেবল তখনই আমরা বলতে পারব, সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত। আজকের কলামটি বিশ্বের সকল শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করলাম।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।