সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

হালদায় ডিম ছাড়ছে মা মাছ

আমির হামজা | প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫:০৮ অপরাহ্ন


ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই হালদাপাড়ে ব্যস্ততা। ডিঙি নৌকা আর বাঁশের ভেলায় চেপে জাল হাতে নদীতে নেমে পড়েছেন পোনা সংগ্রহকারীরা। চোখে-মুখে অপেক্ষার ছাপ—মা মাছ কখন পুরোদমে ডিম ছাড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে নমুনা ডিম ছাড়ার পালা। সকাল ৯টার পর থেকে অল্প অল্প ডিম মিলতে থাকে; বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সেই সংখ্যা।

রাউজানের আজিমেরঘাট, কাগতিয়া, গড়দুয়ারা; হাটহাজারীর রামদাশ মুন্সির হাট, মাছুয়াঘোনা, নয়াহাট—নদীর এমন বিভিন্ন পয়েন্টে নমুনা ডিম ছেড়েছে মা মাছ।

প্রতিটি নৌকায় ২-৩ জন করে জাল ফেলে ডিম সংগ্রহ করছেন আহরণকারীরা। কেউ পেয়েছেন আধা বালতি, কেউ ১-২ বালতি, আবার কারও কারও পাত্রে জমেছে ৫-৬ বালতি পর্যন্ত ডিম। নৌকাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ডিম মিলছে বলে জানিয়েছেন তারা।

ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর, মো. মুন্না ও রোশাঙ্গীর আলম বলছেন, ভারী-হালকা বৃষ্টির পাহাড়ি ঢল আর বজ্রপাতে নদীতে জোয়ার আসায় মা মাছ নমুনা ডিম ছেড়েছে। রাতে পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পুরোদমে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই নমুনা ডিম যে পুরোদস্তুর ডিম ছাড়ার পূর্ব আলামত—তা ভালোই জানেন আহরণকারীরা। তাই নৌকা আর সরঞ্জাম নিয়ে নদীতেই অপেক্ষায় আছেন তারা।

রাউজান উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিমও আশাবাদী। তিনি বলছেন, “বৃষ্টি হওয়ায় নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিবেশ বজায় থাকলে সামনের পূর্ণিমার জোঁ-তে মা মাছ পুরোদমে ডিম ছাড়তে পারে।”

হালদা গবেষক ড. মো. শফিকুল ইসলামের ব্যাখ্যায় মিলছে আরও পরিষ্কার ছবি। কার্পজাতীয় মা মাছের ডিম ছাড়ার পূর্ণিমার জোঁ শুরু হয়েছে ২৯ এপ্রিল থেকে, চলবে ৩ মে পর্যন্ত। এই জোঁ-তে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ি ঢল নেমে এসে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলেছে।

“বুধবার রাতে কয়েকটি স্থানে ১-২টি ডিম পাওয়া গেছে। তবে এখনো পুরোদমে ডিম ছাড়েনি মা মাছ। যেহেতু পূর্ণিমার জোঁ চলছে, রাতে বৃষ্টিপাত হলে পুরোদমে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে,” বলেন তিনি।

প্রকৃতির হিসাব খুব নিখুঁত। ইংরেজি এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাস হালদায় মা মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত মৌসুম। মৌসুমের অমাবস্যা আর পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হলে নদীতে ঢলের প্রকোপ বাড়ে; ঠিক তখনই ডিম ছাড়ে মা মাছ।

গত কয়েক দিনে দিনে-রাতে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান এবং পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দমকা হাওয়া আর প্রবল বর্ষণে হালদায় ঢলের প্রকোপ বেড়েছে।

তবে আহরণের আনন্দের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। রাউজানের তিনটি হ্যাচারির মধ্যে এখন সচল কেবল মোবারকখীল হ্যাচারি। কাগতিয়া হ্যাচারি আর পশ্চিম গহিরা হ্যাচারি বহু বছর ধরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

ফলে রাউজানের ডিম আহরণকারীরা ভরসা করেন কেবল মোবারকখীল হ্যাচারির ওপর। বাকিরা নিজস্ব কুপ বা ছোট পুকুরে রেখেই সংগ্রহ করা ডিম ফুটিয়ে নেন—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই পুরনো রেওয়াজে।