
ভোরের আলো ফোটার আগেই দেড় একর জমির আলপথে দাঁড়িয়ে থাকতেন নাজমুল আলম। সবুজ লতায় ঢেকে যাওয়া ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন বুনতেন—এবার ফলন ভালো হলে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, ঘরের ছাদটা পাকা করা, কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম ইউনিয়নের এই কৃষক জীবনে প্রথমবার তরমুজ চাষে নেমেছিলেন দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে। আজ তাঁর সেই স্বপ্নের ক্ষেতে শুধু শুকনো লতা আর মরা পাতার স্তূপ।
“একটা তরমুজও বিক্রি করতে পারিনি”—কথাটা বলতে গিয়ে নাজমুলের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। ভাইরাসের আক্রমণে গাছগুলো একে একে মরে গেছে চোখের সামনে। পুঁজি তো দূরের কথা, ধার-দেনা শোধ করার পথটাও বন্ধ এখন।
একার নয়, একদলের কান্না
নাজমুল একা নন। মিরসরাইয়ের মাঠে মাঠে এবার একই দৃশ্য—কোথাও মরা গাছের সারি, কোথাও বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাওয়া তরমুজ, কোথাও বিক্রি না হওয়া ফসল পচে নষ্ট হচ্ছে রোদে। উপজেলার কাটাছরা ইউনিয়নের শাহাদাত হোসেনের গল্পটা আরও বুকভাঙা।
পাঁচজন মিলে দশ একর জমিতে তরমুজ চাষে নেমেছিলেন তাঁরা। বিনিয়োগ আঠারো লাখ টাকা—যার সিংহভাগই ব্যাংক, এনজিও আর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করা। মাস কয়েকের পরিশ্রমের পর হাতে এসেছে মাত্র তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। অর্থাৎ লোকসান চৌদ্দ লাখ পঞ্চাশ হাজার।
“অনেক আশা নিয়ে ধার-দেনা করে প্রথমবার তরমুজ চাষ করেছি,” বলেন শাহাদাত। “গাছ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় ফলন খুব কম হয়েছে। যা ফলন হয়েছিল, বৃষ্টির পানিতে তা-ও নষ্ট হয়ে গেছে। লাভ দূরের কথা, নুন্যতম পুঁজি তুলতে পারলেও হতো। এত টাকা ধার-দেনা কী যে করবো, বুঝতে পারছি না।”
সুবর্ণচর থেকে আসা স্বপ্ন
মিরসরাইয়ের তরমুজ চাষের গল্পটা শুরু হয়েছিল আশার বাণী দিয়ে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে আসা অভিজ্ঞ কৃষকরা এখানকার জমি ইজারা নিয়ে তরমুজ ফলিয়েছেন বছর কয়েক। ভালো ফলন দেখে স্থানীয়রাও উৎসাহী হয়েছেন। হিঙ্গুলী, ধুম, ওচমানপুর, ইছাখালী, দুর্গাপুর, মিঠানালা, মঘাদিয়া, মায়ানী, সাহেরখালী—একের পর এক ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়েছে গ্লোরি জাম্বু, বেঙ্গল কিং, ড্রাগন কিং, গ্রীণ ড্রাগন জাতের তরমুজ চাষ।
উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে—আগের যেকোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু আশার সেই বীজ থেকে এবার ফলেছে শুধু হতাশা।
কেউ পাঁচ লাখ, কেউ দশ লাখ, কেউবা পঞ্চাশ লাখ টাকা পর্যন্ত শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন। প্রায় সবার পুঁজির পেছনেই কোনো না কোনো ঋণের বোঝা।

প্রকৃতি আর ভাইরাসের যৌথ আঘাত
কৃষকদের কপালে এবার একসঙ্গে অনেক বিপদ। দিনের বেলা গরম, রাতে কুয়াশা—এই বৈরী আবহাওয়ায় গাছে ছড়িয়ে পড়েছে মড়ক ধরানো ভাইরাস। যেটুকু গাছ টিকে গিয়েছিল, ভারী বৃষ্টি এসে ক্ষেতে পানি জমিয়ে দিয়েছে। তরমুজ পচে গেছে গোড়াতেই।
বাজারের চিত্রটাও সহায় হয়নি। ফলন কম, তার ওপর দাম পড়ে গেছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দূরের বাজারে নিয়ে যাওয়ার খরচও পোষাচ্ছিল না অনেকের।
নাজমুল আলম বলেন, “প্রতি বছর এসব জমিতে ফেলন, সরিষা করে ভালো ফলন হতো। এবার তরমুজে এসে এই অবস্থা।”
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় স্বীকার করেন পরিস্থিতির গুরুত্ব। তিনি বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার মিরসরাইয়ে অনেক বেশি তরমুজ চাষ হয়েছে। সুবর্ণচরের কৃষকদের পাশাপাশি বহু স্থানীয় কৃষকও জমিতে নেমেছিলেন। ভাইরাসের আক্রমণ আর ভারী বৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। যেসব এলাকায় তরমুজ পুষ্ট হয়েছে, সেগুলো দ্রুত বিক্রি করলে ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল বলে তাঁর মত।
কিন্তু কৃষকরা বলছেন, কথা আর বাস্তবতার মাঝখানে দূরত্বটা অনেক বড়।
সামনে কী
সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন—দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত না হলে মিরসরাইয়ের তরমুজ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় অনিবার্য। ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক কৃষকই হয়তো আগামী মৌসুমে আর তরমুজের লতায় হাত দেবেন না।
মাঠজুড়ে কোটি টাকার ক্ষতি, ঘরে ঘরে দুশ্চিন্তার ছায়া। নাজমুল, শাহাদাতদের মতো কৃষকরা এখন শুধু একটাই প্রশ্ন করছেন আকাশের দিকে তাকিয়ে—
“এত ধার-দেনা শোধ করবো কী দিয়ে?”
উত্তরটা এখনো অজানা।