সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সোনাইমুড়ীর ‘জোড়পোলে’ তৃতীয় ব্রিজ, জলাবদ্ধতার শঙ্কা

সাজ্জাদুল ইসলাম | প্রকাশিতঃ ১ মে ২০২৬ | ১২:৪৩ অপরাহ্ন


নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী চৌরাস্তার ঐতিহাসিক ‘জোড়পোল’ এলাকায় বিদ্যমান দুটি ব্রিজের মাত্র ৫ ফুট দূরত্বে নির্মাণ হচ্ছে আরেকটি নতুন ব্রিজ। জেলা পরিষদের অনুমতি নিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় নির্মিত এ ‘তৃতীয়’ ব্রিজের কারণে চারটি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেনের সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক ব্রিজটির অনুমোদন দেন।

এর আগে গত ৯ ডিসেম্বর সোনাইমুড়ী উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত অভিযান চালিয়ে ব্রিজটির নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। গত ২৮ এপ্রিল তিনি বদলি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দ্রুত গতিতে আবার শুরু হয়েছে নির্মাণ কাজ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কের সোনাইমুড়ী চৌরাস্তা অংশে সোনাইমুড়ী-ছাতারপাইয়া এবং সোনাইমুড়ী-কুমিল্লা সড়কের ওপর পাশাপাশি দুটি ব্রিজ (জোড়পোল) আগে থেকেই বিদ্যমান। এর পাশেই বড় আকারে নতুন আরেকটি ব্রিজের কাঠামো গড়ে উঠছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে চলাচলের জন্য এটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

গত বছর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও খালের ওপর তৈরি বাঁধ অপসারণ করেননি নির্মাণকারীরা। সেই থেকে খালের মোহনায় মাটি ফেলে তৈরি অস্থায়ী বাঁধের কারণে পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঁধের ওপর জন্মেছে নানা ধরনের ঝোপঝাড়; দেখে বোঝার উপায় নেই এটি খালের অংশ।

চার খালের সংযোগস্থল

সোনাইমুড়ী চৌরাস্তার জোড়পোল অংশে চারটি প্রবাহমান খালের সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আছে সোনাইমুড়ী বাজার থেকে আসা নৌকাঘাট খাল, সেনবাগ উপজেলা থেকে আসা ছাতারপাইয়া খাল, বজরা ইউনিয়ন থেকে রশিদপুর-বাটরা গ্রাম হয়ে আসা একটি শাখা এবং কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে চাষীরহাট-রামপুর-কাঁঠালি ও বিজয়নগর গ্রামের ওপর দিয়ে আসা আরেকটি খাল।

বিদ্যমান একটি ব্রিজের নিচ দিয়ে নৌকাঘাট ও ছাতারপাইয়া খাল যুক্ত হয়েছে। অপর ব্রিজের নিচ দিয়ে কুমিল্লা সীমান্ত ও বজরা থেকে আসা খাল মিলেছে।

এই চারটি খাল সোনাইমুড়ী ও সেনবাগ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও কৃষি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৪ সালে বন্যা পরবর্তী সময়ে খাল দখলে থাকায় উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল।

নির্মাণ ও অনুমোদনের ধারাবাহিকতা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কামাল হোসেন নামের এক প্রবাসী এ ব্রিজের কাজ করাচ্ছেন। খালের পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার শর্তে জেলা পরিষদের অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

একই স্থানে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল।

জেলা পরিষদের অনুমতিপত্র অনুযায়ী, সোনাইমুড়ী উপজেলার নাওতলা মৌজার ০২,৩৮৪ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ও সাবেক ৬২০ নম্বর দাগের অংশে নিজ জমিতে যাতায়াতের সুবিধার্থে ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি পেয়েছেন মিনু আক্তার। সাবেক ৪৭৬ ও ৬৬৩ নম্বর দাগের সামনে নিজস্ব অর্থায়নে ব্রিজটি নির্মাণের কথা।

পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—ব্রিজ নির্মাণের ফলে খালের পানি প্রবাহ বা জনসাধারণের চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। তবে চিঠিতে ব্রিজের কোনো নির্দিষ্ট মাপ বা নকশার উল্লেখ নেই।

বৃহস্পতিবার বিকেলে নতুন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে জেলা পরিষদের অনুমতিপত্রের প্রেক্ষিতে তিনি কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেননি।

আইন ও কারিগরি দিক

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান দুটি ব্রিজের পাশে এভাবে তৃতীয় আরেকটি ব্রিজ নির্মাণ করলে পানির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে চারটি খালের মুখ ময়লা ও পলি জমে দ্রুত ভরাট হয়ে যাবে।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী, খালের জমির মালিকানা জেলা পরিষদের হলেও সেখানে অবকাঠামো নির্মাণে কেবল প্রশাসনিক অনুমতি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩ এবং জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

কারিগরি প্রকৌশলীদের ভাষ্য, চারটি খালের সংযোগস্থলের মতো সংবেদনশীল স্থানে পানির চাপ ও প্রবাহের গতিবেগ নির্ণয়ের এখতিয়ার একমাত্র পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আইনত একজন সার্ভেয়ারের কাজ কেবল জমি পরিমাপ। ব্রিজের মতো কারিগরি স্থাপনার ফলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চয়তা বা সুপারিশ দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা বা কারিগরি এখতিয়ার তার নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘হাইড্রোলজিক্যাল ক্লিয়ারেন্স’ ছাড়া এ নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মত তাদের।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেন বলেন, ব্রিজ তৈরিতে কোনো সমস্যা হবে না।

তবে চার খালের মিলনস্থলে কারিগরি জ্ঞানহীন একজন সার্ভেয়ারের এমন নিশ্চয়তায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। ইমরানের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে খাল ইজারা ও ব্রিজ নির্মাণের আবেদনে সুপারিশের অভিযোগ রয়েছে। সোনাইমুড়ীর দখল হওয়া নৌকাঘাট খালসহ বিভিন্ন খাল তার সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতেই জেলা পরিষদ ইজারা ও ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। দখলদাররা পরে এসব খালের শ্রেণী পরিবর্তন করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ আজাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদ বলেন, এমন কোনো ব্রিজের অনুমোদনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। চার খালের সংযোগস্থলে ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।