সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, বাংলাদেশে অবনতি

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১ মে ২০২৬ | ৬:২৪ অপরাহ্ন


বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)।

আগামী ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে সংস্থাটি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ এখন ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে।

আরএসএফ বলছে, বিশ্বে এখন প্রতি ১০০ জনে মাত্র একজন নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম থেকে তথ্য পাচ্ছেন।

২৫ বছর ধরে বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতার চিত্র নথিভুক্ত করে আসছে আরএসএফ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মির এ বছরের ফল ‘নাটকীয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

বাংলাদেশের অবস্থান

সূচকে বাংলাদেশের তিন ধাপ অবনতি হয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম; গত বছর ছিল ১৪৯তম।

বাংলাদেশের ঠিক পরেই রয়েছে পাকিস্তান। ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। শ্রীলঙ্কা পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১৩৪তম এবং নেপাল তিন ধাপ এগিয়ে ৮৭তম অবস্থানে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবনতি

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে এসেছে। দেশটির অবস্থান এখন ৬৪তম—বতসোয়ানা ও পানামার মাঝামাঝি।

আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতিতে ‘আগুনে ঘি ঢালছেন’। তবে দেশটিতে এ অবনতি প্রতিরোধযোগ্য বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

আমেরিকা মহাদেশে ট্রাম্পের মিত্র শাসিত আরও কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আর্জেন্টিনার অবস্থান এক বছরে ১১ ধাপ নেমে ৯৮তমে এসেছে; ২০২২ সাল থেকে দেশটির অবস্থান নেমেছে ৬৯ ধাপ।

প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের ‘বিদেশি এজেন্ট’ আইনের আওতায় সাংবাদিকতা কার্যত অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া এল সালভাদরের অবস্থান ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত নেমেছে ৭৪ ধাপ; বর্তমানে দেশটি আছে ১৪৩তম স্থানে।

ইকুয়েডর এ অঞ্চলে এক বছরে সবচেয়ে বেশি পতনের মুখে পড়েছে—২০২৫ সালের ৯৪তম থেকে ৩১ ধাপ নেমে এ বছর তাদের অবস্থান ১২৫তম।

যুদ্ধ ও আইনি কাঠামোর প্রভাব

আরএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ, তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা ও আইনি বাধার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, ইরাক ও সুদানে এর প্রভাব স্পষ্ট।

গণমাধ্যম স্বাধীনতা পরিমাপের পাঁচটি সূচক—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আর্থ-সামাজিক কাঠামো, আইনি কাঠামো ও নিরাপত্তা—এর মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে আইনি সূচকে। বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি দেশে এ সূচকে অবনতি ঘটেছে, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নও রয়েছে।

শীর্ষে নরওয়ে, তলানিতে মধ্যপ্রাচ্য

স্ক্যান্ডিনেভিয়া, বাল্টিক ও উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলো এবারও সূচকের শীর্ষে রয়েছে। টানা দশমবারের মতো বিশ্বে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে নরওয়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে যথাক্রমে নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বলকান অঞ্চল সাংবাদিকতার পরিবেশে অবনতি সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চল গণমাধ্যম স্বাধীনতায় সবচেয়ে নিচের অবস্থানে রয়েছে। তবে সিরিয়ায় নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটি এক বছরে ৩৬ ধাপ এগিয়ে ১৪১তম স্থানে উঠে এসেছে এবং পাঁচটি সূচকেই উন্নতি ঘটেছে। যদিও দেশটি এখনো ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পরিস্থিতির তালিকায় আছে।

আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলেও গণমাধ্যম স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

ইতিবাচক উদাহরণও কিছু রয়েছে। ব্রাজিল ২০২২ সাল থেকে ৫৮ ধাপ এগিয়ে ৫২তম অবস্থানে এসেছে। কসোভো গত বছরের তুলনায় ১৫ ধাপ এগিয়ে ৮৪তম স্থানে উঠেছে—যা পশ্চিম বলকান অঞ্চলে গণমাধ্যম স্বাধীনতার ক্রমাবনতির মধ্যে একটি ব্যতিক্রম।

সংস্থার আহ্বান

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার, মামলা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাধা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আরএসএফ।

আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক আনে বোকঁদে বলেন, “শুধু নীতিমালার কথা বলাই যথেষ্ট নয়—সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা অপরিহার্য, যা পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।”

সাংবাদিকতাকে অপরাধীকরণ বন্ধ করা, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, ‘স্ল্যাপ’ মামলা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজে বাধাদান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বোকঁদের ভাষ্য, “বল এখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তাদের নাগরিকদের কোর্টে। যারা সংবাদমাধ্যমকে স্তব্ধ করতে চায়, তাদের প্রতিরোধ করা তাদেরই দায়িত্ব। কর্তৃত্ববাদের বিস্তার অনিবার্য নয়।”

তথ্যসূত্র: রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস