সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সংসদ ভবনের ছায়ায় ভবিষ্যৎ সাংবাদিকদের একদিন

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১ মে ২০২৬ | ৯:২০ অপরাহ্ন

লুই কানের অমর সৃষ্টি জাতীয় সংসদ ভবন। ধূসর কংক্রিটের বিশাল জ্যামিতিক অবয়ব, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নীলাভ জলাধার, আর সেই জলে প্রতিফলিত হওয়া আকাশ—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত কবিতা। এই কবিতার পাতায় পাতায় পা রেখেছিলেন চট্টগ্রামের একদল তরুণ, যাঁদের চোখে স্বপ্ন—একদিন কলম হাতে তাঁরাই হয়ে উঠবেন সমাজের আয়না।

গত বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ১৪ জন শিক্ষার্থী পা রাখলেন দেশের গণতন্ত্রের সেই পবিত্র অঙ্গনে। বিভাগের চেয়ারম্যান ইয়াসীর সিলমী এবং প্রভাষক সরওয়ার কামালের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই একাডেমিক ভিজিট ছিল ‘ডেপথ রিপোর্টিং’ এবং ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড প্রেজেন্টেশন স্কিল’ কোর্সের একটি বাস্তবমুখী অধ্যায়।

ভোরের আলো ফোটার আগেই চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু। শহর ছেড়ে বাস যখন এগিয়ে চলেছে রাজধানীর দিকে, শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত মিশেল—কৌতূহল, রোমাঞ্চ আর সামান্য বিস্ময়। যে ভবনের ছবি তাঁরা এতদিন দেখেছেন বইয়ের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়, আজ সেই ভবনের আঙিনায় তাঁরা দাঁড়াবেন—এ কেমন অনুভূতি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

সংসদ ভবনে পৌঁছে প্রথম দর্শনেই থমকে দাঁড়ালেন সবাই। স্থাপত্যের ভাষা যে এতটা গভীর হতে পারে, তা যেন নতুন করে উপলব্ধি করলেন তাঁরা। ভবনের প্রতিটি কোণে আলো-বাতাসের অপূর্ব ব্যবহার, উন্মুক্ত জলাধারের প্রশান্ত উপস্থিতি, আর প্রতিটি কাঠামোগত উপাদানের পেছনে লুকিয়ে থাকা দার্শনিক ভাবনা—সব মিলিয়ে যেন এক নীরব শিক্ষাগুরু। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সুনিপুণ বিন্যাস দেখে শিক্ষার্থীরা বুঝলেন, এই ভবন শুধু ইট-পাথরের নয়—এ এক জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক।

এরপর শুরু হলো প্রকৃত পাঠ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে একে তুলে ধরলেন সংসদের অধিবেশন পরিচালনার পদ্ধতি, আইন প্রণয়নের জটিল কিন্তু সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া, এবং সংসদ সদস্যদের বহুমাত্রিক ভূমিকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান, গণতান্ত্রিক চর্চায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব—প্রতিটি কথা শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে গেল।

পাঠ্যবইয়ের পাতায় যে প্রক্রিয়াগুলো ছিল কেবল কিছু শব্দ, আজ তা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। শিক্ষার্থীরা একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন কর্মকর্তাদের দিকে—কীভাবে একটি বিল আইনে রূপান্তরিত হয়, কীভাবে সংসদীয় কমিটি কাজ করে, সংসদ সাংবাদিকতার নৈতিকতা কেমন হওয়া উচিত। প্রতিটি উত্তরে যেন খুলে গেল নতুন দিগন্ত।

বিকেলে অধিবেশনের ফাঁকে শিক্ষার্থীরা সাক্ষাৎ করলেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এ যেন এক জীবন্ত পাঠশালা—যেখানে প্রতিটি কথোপকথন থেকে উঠে আসে এক একটি গল্প, এক একটি অভিজ্ঞতা।

দিনশেষে অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা যখন সংসদ ভবনের কংক্রিট দেয়ালে কোমল প্রলেপ এঁকে দিচ্ছিল, তখন ভবনের সামনের ইটবিছানো প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে স্মারক ছবি তুললেন শিক্ষার্থীরা। হাতে ধরা সাদা ব্যানারে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—”বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একাডেমিক সফর, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ”। ব্যানারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একদল উচ্ছ্বসিত মুখ যেন বলছিল—এই দিনটি শুধু একটি সফর নয়, এ এক স্মরণীয় অধ্যায়, যা আজীবন তাঁদের সঙ্গে থাকবে।

বিভাগের চেয়ারম্যান ইয়াসীর সিলমী এ প্রসঙ্গে বলেন, “শিক্ষার্থীদের জন্য এমন ভিজিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং রাষ্ট্রের কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পায়।” প্রভাষক সরওয়ার কামাল জানান, ভবিষ্যতে আরও নিয়মিতভাবে এ ধরনের শিক্ষা সফর আয়োজন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পেশাগত দক্ষতা অর্জনে আরও এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারেন।

অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও ঝরে পড়ল মুগ্ধতার সুর। তাঁরা বললেন, জাতীয় সংসদ ভবন সরেজমিনে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের সামনে উন্মোচন করেছে এক নতুন দিগন্ত। ভবিষ্যৎ সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্বশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর বাস্তবতা অনুধাবনের দক্ষতা—এই তিনটি গুণ অর্জনে এ ধরনের ভিজিট অপরিহার্য বলে মনে করেন তাঁরা।

ফিরতি পথে ১৪ জন ভবিষ্যৎ সাংবাদিকের ব্যাগে শুধু নোটবুক ছিল না—ছিল এক বুক স্বপ্ন, আর গণতন্ত্রের প্রতি এক নতুন দায়বদ্ধতা। কারণ তাঁরা জানেন, একদিন এই ভবনের করিডোরেই হয়তো তাঁদের কলম লিখবে জাতির ইতিহাস।