
মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, “আজকের দিনটি সেই সব মানুষের জন্য যারা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পৃথিবীকে সচল রেখেছে। পৃথিবীর সকল কর্মঠ মানুষকে জানাই মে দিবসের শুভেচ্ছা।” সেই স্ট্যাটাস তখনো ফেসবুকের পাতায়, লাইক-কমেন্টের ঘরে যোগ হচ্ছিল শুভেচ্ছার বার্তা। অথচ স্ট্যাটাসদাতা মনসুর আহমেদ আজাদ তখন আর এই পৃথিবীতে নেই। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে একটি কালভার্টের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কা চিরতরে থামিয়ে দিয়েছে আটাশ বছর বয়সী এই তরুণ শিক্ষকের জীবন।
শুক্রবার (১ মে) বিকেল তিনটার দিকে কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজের আইসিটি বিষয়ের প্রদর্শক মনসুর আহমেদ আজাদ দুই বন্ধুসহ মোটরসাইকেলে টেকনাফের পথে রওনা হয়েছিলেন। ভাড়া করা মোটরসাইকেলটি তিনি নিজেই চালাচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, পথিমধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কালভার্টের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে মোটরসাইকেলটির। ছিটকে পড়েন পার্শ্ববর্তী বিলের মধ্যে। বন্ধুরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ততক্ষণে যা বলার, তা বলে দিয়েছেন—মনসুর আহমেদ আজাদ আর নেই।
বন্ধুরা জানিয়েছেন, বাইক চালনায় খুব পারদর্শী ছিলেন না আজাদ। শুক্র ও শনিবার কলেজ বন্ধ থাকায় তিন বন্ধু মিলে বৃহস্পতিবার পৌঁছেছিলেন কক্সবাজারে। পরিকল্পনা ছিল সাগরপাড় ঘুরে টেকনাফ যাওয়ার। সেই পরিকল্পনার পথেই থেমে গেল একটি প্রাণ।
বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্যম ইলশা গ্রামের সন্তান আজাদ ছিলেন পূর্ব ইলশা জামালুল কোরআন দাখিল মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা মোক্তার আহমদের বড় ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মোক্তার আহমদ শুধু বললেন, “আমার ছেলে অবিবাহিত। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন আজকে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।”
শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও আজাদের পরিচয় কেবল শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ ছিল না। কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এনায়েত বাজার মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি বাঁশখালীর মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন ‘ফিউশন একাডেমি’ নামের একটি কোচিং সেন্টার, যেখানে তিনি ছিলেন পরিচালক। পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৫ ব্যাচের এই কৃতী ছাত্র শিক্ষাজীবন শেষে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক।
প্রতিবেশী তাজুল ইসলাম স্মরণ করেন শৈশবের আজাদকে। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকে তাকে স্কুল এবং গ্রামের সবাই ‘নানা ভাই’, ‘বাবু ভাই’ নামে ডাকতো। অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত ছিলেন তিনি। আমার এখনও মনে হচ্ছে না তিনি দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন।” এই বিশ্বাস না হওয়ার অনুভূতিই যেন এখন গোটা গ্রামজুড়ে। যে তরুণ ক’দিন আগেও বাজারের রাস্তায় হেঁটে গেছেন, কোচিং সেন্টারে ঢুকেছেন, কলেজের ক্লাসে দাঁড়িয়েছেন—তাঁর হঠাৎ অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, নিহত আজাদের মরদেহ বন্ধুরা ইতোমধ্যে বাঁশখালীর নিজ গ্রামে নিয়ে এসেছেন। গ্রামজুড়ে এখন শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থী, সহকর্মী আর পরিচিতজনদের শোকবার্তা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। সবার একটাই বক্তব্য—বিশ্বাস হচ্ছে না, ‘আজাদ স্যার’ আর নেই।
মে দিবসের সকালে যিনি কর্মঠ মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন, সেই দিনটিই হয়ে রইল তাঁর জীবনের শেষ দিন। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে যাওয়া স্ট্যাটাসটি এখন তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে রয়ে গেল এক অমোচনীয় স্মারক হয়ে—যেখানে শেষ শব্দটি ছিল ‘শুভেচ্ছা’, অথচ তা পরিণত হলো বিদায়বার্তায়।